হামিম উল কবির
প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর সৃষ্টিতে দেরিতে হওয়ায় এবার বাংলাদেশের বর্ষাকালে ভালোই বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, ফলে শুষ্কতার পরিমাণ কম থাকবে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির এডজাঙ্কট প্রফেসর বাংলাদেশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) সাবেক কর্মকর্তা ড. রাশেদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, এবারের মাহসাগরের বায়ুমণ্ডলের মধ্যে পারস্পরিক (ওশেন এটমসফেরিক ইন্টারেকশান) মিথষ্ক্রিয়ার প্রভাব দেখে মনে হচ্ছে যে, এল নিনোর শুরু একটু দেরিতে অর্থাৎ মে থেকে জুলাই এবং পরিণত পর্যায়ে পৌঁছবে আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। এল নিনো কিছুটা দেরিতে শুরু হয়েছে (লেট ওনসেট) বলা যাতে পারে। এই দেরিতে শুরু হওয়ার কারণে বাংলাদেশে বর্তমান বর্ষায় (গ্রীষ্মকাল থেকে শুরু) এল নিনোর প্রভাব তেমন শক্তিশালী হবে না। অর্থাৎ তীব্র খরা হবে না বলাই ভালো। প্রথম দিকে মৌসুমী বায়ু স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকতে পারে (নেয়ার নরমাল) এবং পরের দিকে কিছুটা খরা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সামগ্রিকভাবে এল নিনো নিয়ে যে ন্যারেটিভটা তৈরি হচ্ছে সেটি হলো, এবারের এল নিনোটা খুবই শক্তিশালী বা সুপার এল নিনো হতে যাচ্ছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, সুপার এল নিনো হলেই এটা শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। মনে রাখতে হবে, এল নিনোর প্রভাব শুধু এর নিজের শক্তির উপর নির্ভর করে না, এটা আরো নির্ভর করে এল নিনোটি কখন তৈরি হচ্ছে (অনসেট) অর্থাৎ কোন মাসে বা কোন ঋতুতে তৈরি হচ্ছে এটা জানাটা গুরুত্বপূর্ণ।
ড. রাশেদ চৌধুরী বলেন, এবারো যদি সুপার এল নিনোর ঘটনা ঘটে তাহলে সার্বিক তাপমাত্রা ২ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য যা জানা প্রয়োজন সেটা হলো- যে এল নিনোটা হচ্ছে বা বর্তমানে চলছে তা কতটা শক্তিশালী হবে এবং এর প্রভাব কতটুকু পড়বে।
তিনি বলেন, সাধারণত এল নিনোর শুরুটা (অনসেট) হয় এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে। এরপর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা পরিণত (ম্যাচিউর) হতে শুরু করে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এটা সর্বোচ্চ শক্তি (হাইয়েস্ট স্টেংথ) অর্জন করে। কিন্তু জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো দুর্বল হয়ে যায়। এরপর আবার এপ্রিল থেকে জুনে গিয়ে নিরপেক্ষ (নিউট্রাল) হয়ে যায়। স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৮২-৮৩ সালে এবং ১৯৯৭-৯৮ সালে এল নিনো এভাবেই তৈরি হয়েছিল। সেই বছরগুলোতে ভারী বর্ষণের সৃষ্ট বন্যায় গড়ে ৩০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়।
এবার সুপার এল নিনোর কারণে বিশ্বব্যাপী যে একটা সুপার ইমপ্যাক্ট (বিশাল প্রভাব) পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা হয়তো সেরকম হবে না। বাংলাদেশে এবারের গ্রীষ্মকালটা অনেকটা মাঝারি ধরনের শুষ্ক থাকতে পারে বলে মনে হচ্ছে। কারণ এবারের এল নিনো শুরু হতে হতেই বর্ষা পেয়ে যাবে। বিপরীত দিকে মে থেকে জুনের মধ্যেই বর্তমান এল নিনো স্বাভাবিক হতে শুরু করবে কিন্তু আগামী জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে সেটা শেষ পরিণতির দিকে যখন যাবে তখন বাংলাদেশ থেকে বর্ষা বিদায় নেবে।
তবে বর্ষাকালের পরবর্তী অর্ধেক সময়ে এল নিনোর কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশে সামনের শীতে এল নিনোর প্রভাব পড়লেও কিন্তু বেশি ক্ষতির কারণ হবে না। বড়জোর শীতকালটা তুলনামূলক গরম হবে, খুব বেশি কাঁথা-কম্বলের প্রয়োজন হবে না।
ড. রাশেদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে আরো বলেন, এবারের এল নিনোর শক্তিশালী প্রভাব না পড়ার আরেকটি কারণ রয়েছে। এখনকার ভারত মহাসাগরীয় দ্বি-মেরু বা ইন্ডিয়ান ওশেন ডায়াপোল (আইওডি) এখনো নিরপেক্ষ অবস্থানে আছে। যা বছরের কোনো সময় দুর্বল পজেটিভ হতে পারে। ১৯৯৭-৯৮ সালের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে যে তখনকার আইওডি ছিল ইতিহাসে একটি অন্যতম শক্তিশালী (পজেটিভ)।



