- গালফ অঞ্চলে অব্যাহত আঘাত
- তেহরানের হামলায় তেল আবিবে নিহত ২
- বৈরুতে ইসরাইলি হামলায় নিহত ১২
- ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রীকে হত্যার দাবি ইসরাইলের
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্ঘাত নতুন এক বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছেছে। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানির হত্যার পর দেশটি বহুমাত্রিক পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে ইসরাইলের তেল আবিবে ক্লাস্টার ওয়ারহেডযুক্ত (গুচ্ছ বোমা) ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা চালিয়েছে তেহরান। গতকাল বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এ তথ্য জানিয়েছে।
এ দিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) ইরান জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশটির বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে সঙ্ঘাতের সময় সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
অন্যদিকে গালফ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে আঘাত হানা অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরাইলি বিমান হামলা জোরদার হয়েছে, যা সঙ্ঘাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
তেহরানে শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানাজা : ইরানের রাজধানী তেহরানে বুধবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হয় লারিজানিসহ শীর্ষ সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নামাজে জানাজা। এতে অংশ নেন হাজারো সাধারণ মানুষ, সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা।
এই জানাজায় আরো অন্তর্ভুক্ত করা হয় বাসিজ বাহিনীর প্রধান গোলাম রেজা সোলায়মানি এবং সাম্প্রতিক হামলায় নিহত নৌবাহিনীর সদস্যদের। ইরানি সূত্র মতে, গত মঙ্গলবার তেহরানে ইসরাইলি বিমান হামলায় লারিজানি ও তার ছেলে নিহত হন। একই ধরনের পৃথক হামলায় নিহত হন সোলাইমানি। এই বিশাল জনসমাগম শুধু শোক প্রকাশ নয়, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ সংহতি ও প্রতিরোধের রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানের বহুমাত্রিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ইরানের আধাসামরিক বাহিনী আইআরজিসি জানায়, ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’-এর ৬১তম ধাপে তারা ইসরাইলের ১০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে- খোররামশাহর-৪ (মাল্টিপল ওয়ারহেড সক্ষম), কদর, এমাদ, খেইবারশেকান। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল তেল আবিব, যাকে ইরান ইসরাইলের সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ইসরাইলি সূত্রে জানা যায়, তেল আবিবে সাইরেন বেজে ওঠে, গুশ দান অঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে, বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়, জরুরি সেবা ব্যাহত হয়। হামলায় তেল আবিবের দক্ষিণে অবস্থিত রামাট গান এলাকায় অন্তত দু’জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় ২৩০ জনের বেশি হতাহত হয়েছে, যদিও স্বাধীনভাবে তা যাচাই করা যায়নি।
গালফ অঞ্চলে সঙ্ঘাতের বিস্তার : ইরানের পাল্টা হামলা শুধু ইসরাইলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একই দিনে সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলার খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল- যেখানে প্রধান তেলক্ষেত্র অবস্থিত- সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার চেষ্টা করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের কাছে একটি সামরিক স্থাপনায় হামলার ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। এই বিস্তৃতি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে সঙ্ঘাত এখন একটি বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক রূপ নিচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা গতকাল বুধবার ইরান থেকে আসা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৭টি ড্রোন মোকাবেলা করেছে। মন্ত্রণালয়টি আরো জানায় যে, হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে তারা এখন পর্যন্ত ৩২৭টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,৬৯৯টি ড্রোনের মোকাবেলা করেছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি : হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
বৈরুতে ইসরাইলের পাল্টা অভিযান : এ দিকে ইসরাইল বৈরুতে হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়েছে। লেবানন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল বুধবার ভোরে কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই মধ্য বৈরুতে চালানো ইসরাইলের বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ৪১ জন। ইসরাইলের দাবি, এসব স্থাপনা হিজবুল্লাহর অর্থায়ন ও অপারেশনাল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, যদিও তারা কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি।
টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড : উত্তেজনার নতুন মাত্রা
ইসরাইল দাবি করেছে, তারা ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খাতিবকে হত্যা করেছে। যদিও তেহরান এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিতকরণ দেয়নি। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কারটেজ এই দাবি করেন। যদি এটি সত্য হয়, তাহলে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ইরানের তৃতীয় শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা ঘটবে।
এর আগে নিহত হয়েছেন আলি লারিজানি ও গোলাম রেজা সোলাইমানি। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে এবং প্রতিশোধমূলক হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে চীন : চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বেইজিংয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূতের সাথে এক বৈঠকে ওয়াং ই বলেন, এই যুদ্ধ কখনো হওয়া উচিত ছিল না। আর এটি চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি আমিরাতের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রেও দেশটির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।
মার্কিন উপস্থিতি ও সামরিক উত্তেজনা : ইরান দাবি করেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী এইএসএস আব্রাহাম লিংকন অঞ্চল থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম রেজা হোসেইন মোহসেনি এজেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, সামরিক ব্যর্থতার মুখে ওয়াশিংটন অন্যান্য দেশকে হরমুজে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে উৎসাহিত করছে।
পারমাণবিক ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ : ইরানের বোশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার ঘটনা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানায়, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সংস্থাটির প্রধান রাফায়েল গ্রোসি সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়ানো যায়।
মানবিক সঙ্কট ও যুদ্ধের পরিধি : ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সঙ্ঘাতে এখন পর্যন্ত লেবাননে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত, ইরানে এক হাজার ৩০০ জনের বেশি নিহত, ইসরাইলে অন্তত ১৪ জন নিহত এবং মার্কিন বাহিনীর অন্তত ১৩ সদস্য নিহত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সঙ্ঘাত শুধু সামরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি গভীর মানবিক সঙ্কটে পরিণত হয়েছে।
কূটনৈতিক ভাষ্য ও শক্ত অবস্থান : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এখনো বুঝতে পারেনি যে ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অভিযোগকে ‘একটি বড় মিথ্যা’ হিসেবে আখ্যা দেন।
আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে মধ্যপ্রাচ্য : বর্তমান পরিস্থিতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। এটি আর শুধু ইরান-ইসরাইল দ্বন্দ্ব নয়; গালফ রাষ্ট্র, লেবানন, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত। ইসরাইলের ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের হত্যাকাণ্ড ইরানের প্রতিক্রিয়াকে আরো আক্রমণাত্মক করে তুলছে। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইরানের গালফ আঘাত এবং ইসরাইলের লেবানন অভিযান- এই দুই ফ্রন্ট একত্রে মধ্যপ্রাচ্যকে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে।
লারিজানি হত্যার পর ইরানের প্রতিক্রিয়া শুধু প্রতিশোধমূলক নয়, বরং কৌশলগতভাবে বিস্তৃত। একই সাথে ইসরাইলের বহুমুখী সামরিক অভিযান সঙ্ঘাতকে আরো জটিল করে তুলছে। এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্য এমন এক অনিশ্চিত অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ একটি সীমিত সঙ্ঘাতকে পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিতে পারে- যার প্রভাব শুধু এই অঞ্চলে নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হবে।
বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রে হামলা : ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে গতকাল বুধবার ভোরে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাথে ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম এ খবর জানিয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ এক টেলিগ্রাম বার্তায় জানায়, হামায় স্থাপনাটিতে আগুন ধরে গেছে এবং উদ্ধারকারী ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বর্তমানে ঘটনাস্থলে রয়েছেন।
উল্লেখ্য, ইরানের সাউথ পার্স বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। যেখানে ইরান ও কাতার উভয় দেশের গ্যাস উত্তোলন-বিষয়ক স্থাপনা রয়েছে। এ দিকে সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ইসরাইলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে কাতার।



