গাজায় মানবিক পরিস্থিতির আরো অবনতি

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • দীর্ঘ অচলাবস্থায় গাজা স্থায়ীভাবে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা
  • পশ্চিমতীরে কিশোর নিহত মসজিদে আগুন ও ঐতিহাসিক ভবনে বসতি নির্মাণ
  • গাজার উদ্দেশে ফের যাত্রা শুরু ত্রাণবাহী ফ্লোটিলার

গাজা উপত্যকায় মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসঙ্ঘ। সংস্থাটি জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর মধ্যে চর্মরোগ ও বিভিন্ন সংক্রামক অসুস্থতা বাড়ছে। অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, আবর্জনা অপসারণে বাধা এবং খাদ্যসঙ্কট পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।

জাতিসঙ্ঘের উপ-মুখপাত্র ফারহান হক বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াবিষয়ক জাতিসঙ্ঘের উপ-সমন্বয়কারী রামিজ আলাকবারভ সম্প্রতি দুই দিনের গাজা সফর শেষ করেছেন। সফরে তিনি হাজারো মানুষের জন্য খাবার সরবরাহকারী একটি কমিউনিটি রান্নাঘর পরিদর্শন করেন। খবর আনাদোলুর।

ফারহান হক বলেন, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো জানাচ্ছে যে ইঁদুর ও পোকামাকড় তাঁবুতে ঢুকে খাবার দূষিত করছে। ফলে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে চর্মরোগসহ বিভিন্ন অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি জানান, জাতিসঙ্ঘ ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো স্যানিটেশন ও কীটনাশক ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে, তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য গাজার দু’টি প্রধান আবর্জনা ফেলার স্থান পুনরায় চালু করা জরুরি। তিনি আরো বলেন, পশ্চিম তীরেও সহিংসতা বেড়েছে। গত সপ্তাহে রামাল্লাহ এলাকায় ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় একটি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। ওই ঘটনায় প্রায় ৭০০ গবাদিপশু নিয়ে যাওয়া হয় এবং অন্তত দু’টি পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। জাতিসঙ্ঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১১ মে পর্যন্ত ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় প্রায় ৭০ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০ শিশু রয়েছে। চলতি বছরে পশ্চিম তীরে ৮০০টির বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা প্রতিদিন গড়ে ছয়টি ঘটনার সমান।

দীর্ঘ অচলাবস্থায় গাজা স্থায়ীভাবে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা

গাজায় দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা অঞ্চলটিকে স্থায়ীভাবে বিভক্ত করে ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা নিকোলাই ম্লাদেনভ। তিনি সিএনএনকে বলেন, গাজায় বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে দুই মিলিয়ন ফিলিস্তিনির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এবং ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী হবে। জেরুসালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে ম্লাদেনভ বলেন, “এই স্থিতাবস্থা কারো জন্যই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যত বেশি সময় সমাধান ছাড়া কেটে যাবে, ততই এটি স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হবে।”

২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ইসরাইলি বাহিনী একটি নির্দিষ্ট সীমারেখায় সরে গেলেও পরে সেই নিয়ন্ত্রণ এলাকা আরো বিস্তৃত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে। নতুন মানচিত্র অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৬৪ শতাংশ এলাকা এখন ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি উঠেছে। ম্লাদেনভ সতর্ক করেন, এই সীমারেখা যদি স্থায়ী দেয়াল বা বিভাজনে রূপ নেয়, তাহলে “গাজা আর থাকবে না।” তিনি বলেন, এতে ইসরাইলের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে না, কারণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তিনি জানান, গাজায় হামলা ও গোলাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

পশ্চিম তীরে কিশোর নিহত, মসজিদে আগুন ও ঐতিহাসিক ভবনে বসতি নির্মাণ

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের নতুন হামলায় এক ফিলিস্তিনি কিশোর নিহত হয়েছে। একই সময়ে একটি মসজিদে আগুন দেয়া, বাড়িঘরে হামলা এবং হেবরনের ঐতিহাসিক পৌর ভবনের ওপর নতুন বসতি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার বরাতে আনাদোলু জানায়, নাবলুসের দক্ষিণে আল-লুব্বান আল-শারকিয়া গ্রামে ১৬ বছর বয়সী ফাহদ জেইদান আওয়াইসকে ভোরের আগে গুলি করে হত্যা করে ইসরাইলি বাহিনী। পরে তার লাশও আটকে রাখা হয়। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকর্মীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছতে বাধা দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একই দিন রামাল্লাহর উত্তর-পশ্চিমের জিবিয়া গ্রামে বসতি স্থাপনকারীরা একটি মসজিদে আগুন দেয় এবং কয়েকটি ফিলিস্তিনি মালিকানাধীন গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলাকারীরা বাড়ির দেয়ালে বর্ণবাদী স্লোগানও লিখে যায়।

এ ছাড়া আল-লুব্বান আল-শারকিয়া শহরে বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে দরজা ভেঙে ফেলে। এতে নারী ও শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে হেবরন পৌরসভা অভিযোগ করেছে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ পুরোনো পৌর ভবনের ছাদে নতুন বসতি নির্মাণকাজ শুরু করেছে। ভবনটি হেবরনের পুরোনো শহরে অবস্থিত এবং এটি ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। পৌরসভা বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক আইন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার নীতিমালার লঙ্ঘন। হেবরনের পুরোনো শহর ও ইব্রাহিমি মসজিদ ২০১৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পৌরসভা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি হামলা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ফের গাজার উদ্দেশে যাত্রা শুরু ত্রাণবাহী ফ্লোটিলার

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ত্রাণবাহী নৌবহর তুরস্ক থেকে আবার যাত্রা শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার এই নৌবহর গাজা অভিমুখে রওনা দেয়। এর আগে একই ধরনের দু’টি প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাধার মুখে পড়েছিল। খবর রয়টার্সের। এর আগের দফায় নৌবহরটি স্পেন থেকে ১২ এপ্রিল যাত্রা শুরু করেছিল। তবে সেই সময় ইসরাইলি নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক নৌসীমায় বেশ কয়েকটি জাহাজ আটকে দেয় এবং শতাধিক মানবাধিকারকর্মীকে ক্রিট দ্বীপে নিয়ে যায়। আরো দুইজনকে ইসরাইলে আটক করা হয়। তুরস্কের মারমারা বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করা নতুন এই বহরের সদস্যরা জানিয়েছেন, গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এখন অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে বৈশ্বিক দৃষ্টি অন্য দিকে সরে যাচ্ছে বলেও তারা অভিযোগ করেন। ফ্লোটিলার স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য সুসান আবদুল্লাহ জানান, গাজার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব যথাযথভাবে দেখছে না। অবরোধ এখনো চলছে এবং পর্যাপ্ত সহায়তা প্রবেশ করতে পারছে না। ব্রিটিশ প্রতিনিধি দলের কর্মী ক্যাটি ডেভিডসন বলেন, এর আগে তারা সিসিলি ও ক্রিটের মাঝামাঝি এলাকায় বাধার মুখে পড়েছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেন। তুর্কি অ্যাক্টিভিস্ট শেইমা দেনলি ইয়ালভাচ জানান, গণমাধ্যমের সীমিত প্রচারণাতাদের লক্ষ্য থেকে সরাতে পারবে না। গণমাধ্যম তাদের খবর প্রচার করুক বা না করুক, যাত্রা অব্যাহত থাকবে। অধিকারকর্মীদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মানবাধিকার আন্দোলনকে ভুলভাবে হামাসের প্রতি সমর্থন হিসেবে উপস্থাপন করছে। এর আগে, গত বছরের অক্টোবরে একই সংগঠনের একটি নৌবহর ইসরাইলি সেনারা থামিয়ে দেয়। সেই ঘটনায় সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থ্রুনবার্গসহ ৪৫০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারীকে আটক করা হয়েছিল। গাজার ২০ লাখের বেশি মানুষের অনেকেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাড়িঘর, অস্থায়ী তাঁবু ও রাস্তায় আশ্রয় নিয়ে তারা মানবিক সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছেন।