- এক মাঠে ৬১ জাতের ধান, কৃষকের সামনে গবেষণার জীবন্ত প্রদর্শনী
- ১৫ প্রযুক্তি গ্রামে রাইস গার্ডেন, বাড়ছে কৃষক-গবেষক সংযোগ
কাওসার আজম
বাংলাদেশের কৃষি এখন এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খরা, আকস্মিক বন্যা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রমহ্রাসমান আবাদযোগ্য জমি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই প্রোপটে অঞ্চলভিত্তিক ধানের জাত উদ্ভাবন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং গবেষণাকে মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেই উদ্যোগের সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যতিক্রমধর্মী সংযোজন এখন ‘রাইস গার্ডেন’।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ‘নতুন ০৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণার উন্নয়ন (এলএসটিডি)’ প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা এই রাইস গার্ডেন ইতোমধ্যে কৃষক, গবেষক, শিার্থী ও কৃষি উদ্যোক্তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত এসব প্রদর্শনী ত্রেকে অনেকে ধান গবেষণা ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের নতুন দিগন্ত হিসেবেও দেখছেন।
ধান গবেষণায় অভিনব সংযোজন
‘রাইস গার্ডেন’ নামটি নিজেই কৌতূহল জাগায়। সাধারণত মানুষ ফুল, ফল বা শোভাবর্ধক বাগানের সাথে পরিচিত। কিন্তু ধানের জাতভিত্তিক এমন গবেষণামূলক গার্ডেন বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় নতুন সংযোজন। এলএসটিডি প্রকল্পের পরিচালক ড. মো: আনোয়ার হোসেনের পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনায় পরিচালিত এই উদ্যোগের মূল ল্য হলো টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী ধানের জাত নির্বাচন করা এবং গবেষণার ফলাফল সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া।
এক মাঠে ৬১টি ধানের জাত
রাইস গার্ডেনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো একই মাঠে ৬১টি ধানের জাতের সমন্বিত প্রদর্শনী। এর মধ্যে রয়েছে ৫৬টি ইনব্রিড এবং ৫টি হাইব্রিড জাত। বাংলাদেশের ধান গবেষণায় এ ধরনের বৃহৎ সমন্বিত প্রদর্শনী নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখানে উচ্চফলনশীল ব্রি ধান১০০, ১০২, ১০৮, ১১৬ ও ১১৮ প্রদর্শিত হচ্ছে। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৬৭, ৯৭ ও ৯৯ স্থান পেয়েছে। রয়েছে বাসমতি টাইপের সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ব্রি ধান১০৪ এবং লো-জিআই সম্পন্ন ডায়াবেটিক রাইস ব্রি ধান১০৫। এ ছাড়া ব্লাস্ট প্রতিরোধী ব্রি ধান১১৪সহ বিভিন্ন পুষ্টিসমৃদ্ধ ও ঘাতসহনশীল জাতও প্রদর্শিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপকূলীয় লবণাক্ত পরিবেশে ব্রি ধান৬৭ ও ব্রি ধান৯৯ তুলনামূলক ভালো ফলন দেখিয়েছে, যা দণিাঞ্চলের কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্য দিকে ব্রি ধান১০৫ লো-জিআই বৈশিষ্ট্যের কারণে পুষ্টিনির্ভর খাদ্য নিরাপত্তা এবং ডায়াবেটিস-সংবেদনশীল খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, লো-জিআই চাল রক্তে গ্লুুকোজের মাত্রা ধীরে বাড়ায়, ফলে নিয়ন্ত্রিত খাদ্য পরিকল্পনায় এটি বেশি উপযোগী।
সুগন্ধি ব্রি ধান১০৪ প্রিমিয়াম চালের বাজারে বাণিজ্যিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত তৈরি করছে। একই সাথে ব্রি ধান১০০ ও ব্রি ধান১০২ চিকন, জিংকসমৃদ্ধ ও জিরা-টাইপ ধান হিসেবে পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং গর্ভবতী নারীদের পুষ্টি ঘাটতি পূরণেও এগুলো সহায়ক হতে পারে।
কৃষি বিজ্ঞানীরা বলেন, ধান উৎপাদনের অন্যতম বড় হুমকি ব্লাস্টরোগ মোকাবেলায় ব্রি ধান১১৪ জাতটিকে কার্যকর প্রতিরোধী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ব্রি ধান১০৮ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৮ উচ্চফলনশীল জাত হিসেবে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে দণিাঞ্চলের ঘেরভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় ব্রি হাইব্রিড ধান৮ অনুকূল ব্যবস্থাপনায় প্রতি শতকে ১ মণের বেশি ফলনের সম্ভাবনা দেখিয়েছে।
ফলে কৃষকরা এখন একই মাঠে বিভিন্ন জাতের বৈশিষ্ট্য, ফলন সম্ভাবনা, জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধ মতা ও অভিযোজন সমতা সরাসরি পর্যবেণ করতে পারছেন। গাছের গঠন, শীষের মান এবং পরিপক্বতার সময়কালও মাঠেই বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে।
সারা দেশে ১৫টি রাইস গার্ডেন
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় দেশের নতুন ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয়, ৬টি স্যাটেলাইট স্টেশন এবং বিদ্যমান ৩টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রযুক্তি গ্রামে মোট ১৫টি রাইস গার্ডেন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বোরো ২০২৫-২৬ মৌসুমে দিনাজপুরের কাউগা প্রযুক্তি গ্রামে ৫৪টি, খাগড়াছড়ির পাইলটপাড়ায় ৫৫টি, কক্সবাজারের পশ্চিম চাকমারকুলে ৫৪টি, সুনামগঞ্জের উজানীগাঁওয়ে ৫১টি, টাঙ্গাইলের কিসামতে ৫১টি এবং নেত্রকোনার বাদেবিন্নায় ৫৯টি ধানের জাত নিয়ে রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়েছে।
একইভাবে খুলনা, পটুয়াখালী, পঞ্চগড়, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট স্যাটেলাইট স্টেশনের প্রযুক্তি গ্রামগুলোতেও যথাক্রমে ৫৮, ৫৬, ৫১, ৫৬, ৫১ ও ৫৫টি ধানের জাতের সমন্বয়ে রাইস গার্ডেন গড়ে তোলা হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে অঞ্চলভিত্তিক জাত নির্বাচন
রাইস গার্ডেন কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। দেশের ১৫টি ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে স্থাপিত এসব গার্ডেন থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এনভায়রেনমেন্ট জেনোটাইপ (ঊদ্ধএ) বিশ্লেষণ করা হবে। এর মাধ্যমে পরিবেশ ও জাতের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে ধানের অভিযোজন সমতা ও ফলনশীলতা বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের কৃষি-পরিবেশগত বৈচিত্র্যের কারণে একই ধানের জাত সব অঞ্চলে সমান ফলন দেয় না। মাটি, পানি, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা কিংবা খরার প্রভাবে ফলন ও অভিযোজন মতায় বড় পার্থক্য দেখা যায়। ফলে অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী ধানের জাত নির্বাচন এখন কৃষির অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার।
এই ল্েযই একই পরিবেশে মৌসুমভিত্তিক বিভিন্ন ধানের জাতের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য লবণাক্ততা সহনশীল জাত, হাওরের জন্য স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত, খরাপ্রবণ এলাকার জন্য কম পানিনির্ভর জাত এবং পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য অভিযোজনম জাত নির্বাচন ও সম্প্রসারণ আরো কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকের সাথে গবেষণার সেতুবন্ধন
বর্তমানে ‘রাইস গার্ডেন’ কেবল প্রদর্শনী ত্রে নয়। কৃষকের জন্য এটি উন্মুক্ত ফিল্ড ল্যাবরেটরি ও বাস্তবভিত্তিক কৃষি শিাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলএসডিটিডি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। প্রতিদিন স্থানীয় কৃষক, কৃষিশ্রমিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী এবং স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থীরা এসব গার্ডেন পরিদর্শন করছেন। অনেকে একে ‘ধানের জীবন্ত জাদুঘর’ বলেও অভিহিত করছেন।
গবেষক ও কৃষিবিদরা বলছেন, একসময় নতুন ধানের জাত সম্পর্কে জানতে কৃষকদের কৃষি অফিস কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সেই ব্যবধান অনেকটাই কমেছে। নিজ এলাকার মাঠেই কৃষকরা বিভিন্ন জাত দেখে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। পাশাপাশি ধানের জীবনচক্র, আধুনিক ফসল ব্যবস্থাপনা, রোগ শনাক্তকরণ, সুষম সার প্রয়োগ, যান্ত্রিক রোপণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি পদ্ধতি সরাসরি পর্যবেণ ও অনুশীলনের সুযোগ পাচ্ছেন।
ব্রি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত মোট ১২৭টি বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ধানের জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করেছে, যার মধ্যে বোরো মৌসুমে চাষের উপযোগী ৬১টি জাত রয়েছে। এসব জাতকে কৃষকের মাঠে ‘রাইস গার্ডেন’ আকারে প্রদর্শনের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক শিণ ও নির্বাচন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষক নিজ এলাকার জমি, আবহাওয়া ও পরিবেশগত উপযোগিতা বিবেচনা করে বিভিন্ন জাতের ফলন, গাছের উচ্চতা, খড়ের পরিমাণ, রোগবালাই সহনশীলতা, চালের গুণগত মান, বাজারমূল্য ও ভোক্তা চাহিদা বিশ্লেষণ করে নিজের জন্য উপযোগী জাত নির্বাচন করতে পারবেন। ফলে জাত নির্বাচনের েেত্র তাকে আর অন্যের পরামর্শের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হতে হবে না।
কৃষক ও গবেষকের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে কৃষিকে আরো টেকসই, লাভজনক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ল্েযই কৃষকের মাঠে এসব রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়েছে।



