বাকৃবি প্রতিনিধি
প্রাণিখাদ্যের ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমর্থিত ‘ইঅট-ঋঝ’ নামে একটি স্মার্ট সফটওয়্যার প্যাকেজ উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। সফটওয়্যারটি পোলট্রি, গবাদিপশু ও মাছের খাদ্য প্রস্তুতে সর্বনিম্ন খরচে সুষম খাদ্য ফর্মুলা নির্ধারণে সহায়তা বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
প্রকল্পটির প্রধান গবেষক (পিআই) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাকৃবির পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: শহিদুর রহমান। ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ভ্যালিডেশন অব সফটওয়্যার অ্যাসিস্টেড লাইভস্টক অ্যান্ড পোলট্রি ফিডিং ফর প্রোডাক্টিভিটি’ শীর্ষক গবেষণা প্রকল্পের আওতায় এবং লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলডিডিপি) অর্থায়নে এ সফটওয়্যারটি উদ্ভাবন করা হয়েছে।
সম্প্রতি বাকৃবির অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি অনুষদের সম্মেলন কক্ষে ওই প্রকল্পের সমাপনী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো: শহিদুর রহমান।
কর্মশালায় অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো: রুহুল আমিনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন ভিসি অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন- ময়মনসিংহ প্রাণিসম্পদ অফিসের পরিচালক ডা: মনোরঞ্জন ধর। এ ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্পটির প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো: শহিদুর রহমান বলেন, ‘ইঅট-ঋঝ’ সফটওয়্যার খাদ্যোপাদানের পুষ্টিমান, বাজারদর ও গুণগত বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘লিস্ট-কস্ট’ বা সর্বনিম্ন ব্যয়ের খাদ্য ফর্মুলা তৈরি করতে সক্ষম। একই সাথে এতে যুক্ত করা হয়েছে দেশের প্রথম ‘বাংলাদেশ ডিজিটাল ফিড লাইব্রেরি’ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে খাদ্যোপাদানের ছবি, পুষ্টিমান ও ভৌত বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে একটি ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, প্ল্যাটফর্মটির স্যাম্পল কম্পারিজন ফিচারের মাধ্যমে খামারি ও খাদ্যোপাদান ক্রেতারা বিভিন্ন উপাদানের পুষ্টিমান ও দামের তুলনা করে তাৎক্ষণিকভাবে কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা নিজেরাই মানসম্মত খাদ্য প্রস্তুত করতে সক্ষম হবেন এবং খাদ্য ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় করে লাভজনকভাবে খামার পরিচালনা করতে পারবেন।
গবেষকের মতে, দেশের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস পোলট্রি খাত। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু দৈনিক প্রায় ১৩৬ গ্রাম গোশত এবং বছরে ১৩৬টি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। তবে মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে। খাদ্যের সঠিক পুষ্টিমান নির্ধারণে ভুল হলে এক দিকে খামারিদের ব্যয় বাড়ে, অন্য দিকে উৎপাদনশীলতাও কমে যায়।
গবেষণায় ফলাফল বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ফিড মিলার এখনো খাদ্য প্রস্তুতে প্রচলিত অভিজ্ঞতা, বইভিত্তিক তথ্য এবং খাদ্যোপাদানের বাহ্যিক রঙ বা গন্ধের ওপর নির্ভর করেন। অথচ একই ধরনের উপাদান যেমন ভুট্টা, রাইস পলিশ, সয়াবিন মিল বা গমের ভুষির উৎস, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ভিন্নতার কারণে পুষ্টিমানে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যে পুষ্টির ঘাটতি বা অতিরিক্ততা তৈরি হয়ে উৎপাদনশীলতা ও লাভজনকতা কমে যায়।
এই সমস্যা সমাধানে গবেষণার অংশ হিসেবে প্রায় ২৫০ ধরনের পোলট্রি খাদ্যোপাদানের ছবি, পুষ্টিমান ও ভৌত বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি ডিজিটাল পিক্টোরিয়াল ফিড লাইব্রেরি তৈরি করা হচ্ছে। এতে খাদ্যের রঙ, আকার, গঠন ও মানসংক্রান্ত তথ্য যুক্ত থাকবে, যা খামারি ও ফিড প্রস্তুতকারীদের মানসম্মত খাদ্যোপাদান শনাক্তে সহায়তা করবে।
তিনি আরো জানান, আধুনিক এআই, মেশিন লার্নিং ও ইমেজ প্রসেসিং প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্যোপাদানের ছবি বিশ্লেষণ করে পুষ্টিমান অনুমানের সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারদর, পুষ্টিচাহিদা ও খাদ্যের গুণগত মান বিবেচনায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাশ্রয়ী খাদ্য ফর্মুলা তৈরির জন্য একটি ব্যবহারবান্ধব সফটওয়্যার উন্নয়ন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, গবেষণায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও উপ-উপাদান বিবেচনায় নিয়ে মানসম্মত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি কার্যকর ইনডেক্স তৈরি করা হয়েছে, যা প্রাণিসম্পদ খাতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখবে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে খামারি, ফিড মিলার ও কাঁচামাল আমদানিকারকরা উপকৃত হবেন।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হলে সফটওয়্যারটির কার্যকারিতা ও নির্ভুলতা আরো বাড়বে। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি বিনামূল্যে চালুর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তীতে সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক মডেলে নেয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সফটওয়্যারটির কার্যকারিতা যাচাইয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।



