ববির নতুন ভিসির নিয়োগেই অসন্তোষ

Printed Edition

ববি প্রতিনিধি

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) নবনিযুক্ত ভিসি অধ্যাপক ড. মো: মামুন অর রশিদের নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগের খবর প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে সমালোচনার ঝড় বইছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দাবি, বিতর্কিত ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা একজনকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, অধ্যাপক মামুন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালীন আর্থিক দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের সাথে জড়িত ছিলেন। পবিপ্রবির জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের (ইউটিএবি) সভাপতি হিসেবেও তিনি বিতর্কিত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন একজন ব্যক্তিকে দক্ষিণবঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের অভিভাবক হিসেবে মেনে নিতে পারছেন না সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রিপন বলেন, ‘আমরা দক্ষ ও প্রশাসনিকভাবে অভিজ্ঞ একজন ভিসি প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাকে ঘিরে নানা অভিযোগ থাকায় আমাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন ভিসির কলুষিত অতীত কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। আমরা এমন একজন ভিসি চাই যার শিক্ষা ও গবেষণায় দেশজুড়ে খ্যাতি আছে এবং যিনি স্বৈরাচারী আমলে জুলুমের শিকার হয়েছেন। বিতর্কিত কাউকে আমরা এই পবিত্র ক্যাম্পাসে মেনে নেব না।’

জাতীয় ছাত্রশক্তির ববি শাখার আহ্বায়ক মো: বেলাল বলেন, ‘সবাই জানত নিয়োগ দলীয় হবে, কিন্তু তাই বলে একজন দলীয় ক্যাডার নিয়োগ হবে, এমনটা কেউ আশা করেনি। ছাত্ররা তাদের যোগ্য অভিভাবক পাচ্ছে না, যা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবিয়ে তুলছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকও নাম প্রকাশ না করার শর্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিতর্কিত ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ একজনকে নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেয়ার পরিবর্তে পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। পবিপ্রবিতে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় এমন নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করবে।

বিদায়বেলায় কাঁদলেন ভিসি তৌফিক আলম

শিক্ষার্থীদের পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় নিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) সদ্য বিদায়ী ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম।

শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিদায়লগ্নে প্রিয় ভিসিকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের যেমন আবেগ উপচে পড়ে, তেমনই নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি তিনি নিজেও। বিদায়ের এই ক্ষণে কোনো বিলাসবহুল গাড়ি নয়, চোখ মুছতে মুছতে নিজের চিরচেনা মোটরসাইকেলে চড়ে একাই ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নেন এই সাদামাটা মানুষটি।

ভিসির এমন নজিরবিহীন ও মানবিক বিদায়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট ও স্মৃতিচারণ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

রবিউল শিকদার নামে এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে ভিসির সাথে একটি ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন বিদায়ী ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। এমন সাদামাটা মানুষ আসলে পাওয়া কঠিন, যার মধ্যে কোনো প্রশাসনিক দাম্ভিকতা ছিল না, ছিল না কোনো বাড়তি সুবিধা নেয়ার লোভ। তবে প্রথম থেকে তার এই অতিরিক্ত সহজ-সরল রূপটি আমার পুরো পছন্দ ছিল না। হয়তো তার এই অতি সরলতার সুযোগ নিয়েই শিক্ষকরা তার বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার সাহস পেয়েছিলেন। পরিশেষে স্যার, আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকবেন।

শাহাদাত নামে আরেক শিক্ষার্থী তার অনুভূতি প্রকাশ করে লিখেছেন, তিনি যেমন একা এসেছিলেন, হয়তো নিজের মতো করে ভালো কিছু করার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি যোগ্য কোনো সঙ্গী পাননি। শেষ পর্যন্ত তিনি একাই বিদায় নিলেন। যোগ্যতার চুলচেরা বিশ্লেষণে যাব না, তবে মানুষ হিসেবে তিনি অত্যন্ত খাঁটি ছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের সাথে বন্ধুর মতো মিশেছিলেন। ভালো থাকবেন স্যার।

এদিকে ভিসির অনন্য মানবিকতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার এক চমৎকার গল্প তুলে ধরেছেন সিমান্ত নামের এক শিক্ষার্থী। নিজের হারিয়ে যাওয়া পোষা বিড়ালকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া এক স্মৃতির কথা তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, একদিন আমার পোষা বিড়ালটি হারিয়ে গেলে আমি সরাসরি ভিসি স্যারের রুমে যাই। যেহেতু স্যারের নিজেরও বিড়াল ছিল এবং তিনি এর আগে ক্যাম্পাসে আমার বিড়ালটিকে বহুবার কোলে নিয়ে আদর করেছিলেন, তাই আমি সাহস করে উনাকে বলি স্যার, সবাই তো আপনার কাছে একাডেমিক দাবি নিয়ে আসে, আমি একটি ব্যক্তিগত দাবি নিয়ে আসছি। বলতে ভয় হচ্ছে, তাও বলছি স্যার।

সিমান্ত আরো লিখেছেন, এরপর আমি স্যারকে একটি ভিডিও দেখাই, যেখানে উনি নিজে ১১ চত্বরে বসে আমার বিড়ালটিকে আদর করছিলেন। আমি উনাকে জানাই যে আমার বিড়ালটি হারিয়ে গেছে। সব শুনে স্যার তাৎক্ষণিক নিজ থেকেই বলে উঠলেন, তোমার কি বিড়াল লাগবে? আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে উনি পরম মমতায় বললেন, আমার বিড়ালগুলো তো এখনো ছোট বাচ্চা। এখন মায়ের কাছ থেকে আলাদা করলে ওরা কষ্ট পাবে। তুমি এক মাস পর আমার সাথে যোগাযোগ করো, ওরা একটু বড় হোক। এরপর যখন আমি রুম থেকে বের হচ্ছি, তখন উনি আবার ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন রঙের বিড়ালটা তোমার পছন্দ? এরপর আমি সালাম দিয়ে চলে আসি। ভেবেছিলাম ঈদের পর যোগাযোগ করব। কিন্তু এর কয়েকদিন পরই স্যার আমার সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে উনাদের অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আমাকে খুঁজে বের করার জন্য বার্তা পাঠান।

একজন ভিসি হয়েও শিক্ষার্থীর বিড়াল হারিয়ে যাওয়ার কষ্টে নিজের শখের বিড়াল উপহার দিতে উন্মুখ হয়ে খোঁজাখুঁজি করছেন, এই বিষয়টি যে কতটা সুন্দর ও মানবিক, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

ক্যাম্পাসের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সিমান্ত লিখেছেন, উনি ক্যাম্পাসে কতটুকু করতে পেরেছেন বা পারেননি, তা নিয়ে আমি কথা বলব না। অনেক ভিসি তো এলেন আর গেলেন, কে কয়টা বিল্ডিং বানিয়েছেন তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু উনার মতো এত ফ্রেন্ডলি এবং বন্ধুবৎসল একজন মানুষ আর কখনো পাওয়া যাবে কি না, তা আমার জানা নেই।

প্রশাসনিক চেয়ারের কঠোরতা ছাপিয়ে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে একজন পথপ্রদর্শক ও সত্যিকারের অভিভাবক হিসেবে যে স্থান করে নিয়েছেন, এই অশ্রুসিক্ত বিদায় তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।