সংসদ প্রতিবেদক
দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষই বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করে সঙ্কট সমাধানে একসাথে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: মো: শফিকুর রহমান কর্তৃক উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এই আশ্বাস দেন।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়; বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই মোকাবেলা করছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।’
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জাতীয় সংসদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্মরণ করে বলেন, ‘এই সংসদ বহু শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত এবং এটি দেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের স্বার্থে সব দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের দাবি।’ তিনি জ্বালানি সঙ্কটের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতার উত্থাপিত আলোচনাকে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন।
বিরোধী দলের প্রস্তাবনা ও সরকারের অবস্থান
সংসদ নেতা স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে সরকার সবসময় উন্মুক্ত ও ইতিবাচক। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আসা যেকোনো গঠনমূলক প্রস্তাব বা সুপারিশকে সরকার গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে। এ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আমরা যে অবস্থানেই থাকি না কেন, দেশের জনগণ আমাদের এখানে পাঠিয়েছে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। মানুষের কল্যাণে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাস্তবতার নিরিখে গ্রহণযোগ্য সব প্রস্তাবনা আমলযোগ্য হবে।’
আলোচনার প্রেক্ষাপট
এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: মো: শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালী-বিধির ৬৮ বিধি অনুসারে দেশের জ্বালানি সঙ্কট ও জনদুর্ভোগ নিয়ে জরুরি আলোচনা উত্থাপন করেন। তার এই আলোচনায় বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্যরা অংশ নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি, জনভোগান্তি এবং সঙ্কট উত্তরণের পথ নিয়ে নিজস্ব মতামত ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষাংশে বিরোধীদলীয় নেতা ও আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুতে এমন গঠনমূলক আলোচনা দেশের মানুষের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।’
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, এই আলোচনায় উত্থাপিত প্রস্তাব ও সুপারিশগুলো পরবর্তী সময়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাব বিরোধীদলীয় নেতার
দেশে চলমান জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কটে জনভোগান্তির চিত্র তুলে ধরে এই জাতীয় সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি ‘যৌথ কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: মো: শফিকুর রহমান। একই সাথে তিনি জানিয়েছেন, পাম্পে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে হিটস্ট্রোকে এ পর্যন্ত তিনজন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ‘দেশের বর্তমান জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ’ শীর্ষক আলোচনার প্রস্তাব উত্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয়।
মাঠপর্যায়ের মানবিক বিপর্যয়
বিরোধীদলীয় নেতা পাম্পগুলোর করুণ দশা বর্ণনা করে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে দুই-চার লিটার সংগ্রহের আশায় হিটস্ট্রোকে তিনজন কৃষক মারা গেছেন। মানুষ ৫ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত পাম্পে অপেক্ষা করছে। যারা দৈনিক ১৫০০-২০০০ টাকা আয় করতেন, তেলের অভাবে এখন তাদের আয় ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর প্রতি আমাদের সদয় হওয়া উচিত।’
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘আমি সরকারি দলকে ধন্যবাদ জানাই। আগে তারা বলেছিলেন কোনো সঙ্কট নেই, কিন্তু আজ ৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতির চেয়ে বাস্তবমুখী ও ইতিবাচক বক্তব্য এসেছে। দেরিতে হলেও সরকার অন্তত সত্য স্বীকার করেছে।’
যৌথ কমিটি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
জ্বালানি খাতের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে শফিকুর রহমান সরকারি ও বিরোধী দলের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমাদের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল থাকতে হবে। সরকার চাইলে আমরা একটি ‘কমন কমিটি’ গঠন করতে পারি। আমাদের কাছে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা আছে, যা আমরা সরকারের হাতে তুলে দিতে চাই।’
অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
সঙ্কটকালীন অসাধু ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সঙ্কট এলে কিছু লোক সুযোগ নেয়ার জন্য ঘাপটি মেরে বসে থাকে। এই অসাধু লোক যদি আমি নিজেও হই, তবে আমাকেও ছাড় দেবেন না। জাতির স্বার্থে তাদের পাকড়াও করুন এবং জনগণের সামনে পরিচয় উন্মোচিত করে দিন।’
দোষারোপের রাজনীতি বর্জনের ডাক
সংসদে একে অপরের ‘চরিত্র হনন’ বা গালিগালাজ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা ঠেলাঠেলির রাজনীতি বন্ধ করি। একে অপরের দোষ না খুঁজে গঠনমূলক সমালোচনা করি। দেশের মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা ‘না পারার’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘সমাধানের’ সংস্কৃতিতে যেতে চাই।’
বক্তব্যের শেষে আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আসুন তিক্ততা ভুলে আমরা সবাই মিলে দেশের জন্য ভালো কিছু করে যাই। যেন মরার আগে এই তৃপ্তি নিয়ে যেতে পারি যে, এই জাতির ক্রান্তিকালে আমরা কিছু একটা করতে পেরেছি।’
এর আগে দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিকে তীব্র সঙ্কট হিসেবে অভিহিত করে তা নিরসনে সরকারের জরুরি ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: মো: শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ হলেও সরকারের সংশ্লিষ্টরা প্রকৃত চিত্র অস্বীকার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন।
বিরোধীদলীয় নেতার নোটিশের জবাবে বক্তব্যে দেশে জ্বালানি পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘সঙ্কট’ বলতে রাজি নন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, সরকার নিয়ন্ত্রিত ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। তবে জ্বালানি নিয়ে অবৈধ মজুদ, কালোবাজারি ও পাচারের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে (বিধি-৬৮) সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিরোধীদলীয় নেতার আনা প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বিষয়টি আলোচনায় আসায় তিনি একে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করেন।
জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার অভিযোগ
৬৮ বিধি অনুসারে নোটিশে ডা: মো: শফিকুর রহমান বলেন, ‘সারা দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কটে জনজীবন বিপর্যস্ত। পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে। এই সঙ্কটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায়।’
তিনি আরো যোগ করেন, সরকার বাস্তবতাকে এড়িয়ে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দাবি করছে, যা সঙ্কটকে আরো জটিল করে তুলছে। দেশে জ্বালানির প্রকৃত মজুত, সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ে শ্বেতপত্র বা স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানান তিনি। বিরোধীদলীয় নেতার এই আলোচনার প্রস্তাবে মো: সাইফুল আলম খান মিলন, মো: রফিকুল ইসলাম খান, মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল, মো: মাহবুবুল আলম এবং মীর আহমাদ বিন কাসেমসহ আরো পাঁচজন সংসদ সদস্য সমর্থন দেন।
জ্বালানি পরিস্থিতিকে সঙ্কট বলা ঠিক হবে না
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি পরিস্থিতিকে সরাসরি সঙ্কট বলা ঠিক হবে না। আমাদের কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব জাতীয় কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যাতে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।’
তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের অনেক দেশে জ্বালানির দাম ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লেও বাংলাদেশে তা ১৫ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে সহনীয় পর্যায়ে রাখা হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ ঘটার অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, কিছু অসাধু চক্র কালোবাজারি, অবৈধ মজুদ ও পাচারের মাধ্যমে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা করেছে। র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এসব অনিয়ম উদঘাটন করছে।
অপরাধীদের কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কালোবাজারির পরিচয় কেবলই কালোবাজারি। এখানে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। দোষারোপের রাজনীতি নয়, আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই এদের দমন করা হবে। তিনি আরো জানান, সীমান্ত এলাকায় জ্বালানি পাচার ঠেকাতে সরকার কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। পুলিশসহ সব বাহিনীকে আরো আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, ‘ওভারনাইট সব কিছু পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবে ধাপে ধাপে সংস্কারের কাজ চলছে। অতীতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া অনেক এলাকা এখন আবার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার ‘মব কালচার’ বন্ধ করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
জাতীয় ইস্যুতে সরকার ও বিরোধীদলের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘সংসদই হোক সব সমস্যার সমাধানের কেন্দ্র। এখান থেকে আসা গঠনমূলক পরামর্শ বাস্তবায়নে সরকার সর্বদা প্রস্তুত।’ তিনি সংসদে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা বজায় রাখতে বিরোধীদলসহ সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
সরকারের জবাব ও প্রস্তুতি
বিরোধীদলীয় নেতার নোটিশের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, বর্তমান সরকার অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। তিনি জানান, সরকার আগামী মে মাস পর্যন্ত জ্বালানির চাহিদা নিশ্চিত করেছে এবং বর্তমানে জুন-জুলাই মাসের চাহিদা পূরণে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যখন এই সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন জ্বালানি তেলের মজুদ ছিল মাত্র সাত দিনের। এর পরপরই ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় আমাদের আমদানি মারাত্মকভাবে বিঘিœত হয়। তবে দ্রুত বিকল্প উৎস সন্ধান করায় আমরা এখন একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছি।
আন্তর্জাতিক বাজার ও ভর্তুকি
বিশ্ববাজারের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, গত দুই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের মূল্য ১৪২.৭৩ শতাংশ বাড়লেও বাংলাদেশে মাত্র ১০ থেকে ১৬ শতাংশ সমন্বয় করা হয়েছে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রথম ৪৫ দিন সরকার কোনো দামই বাড়ায়নি। যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় জ্বালানির দাম ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়ানো হলেও বাংলাদেশ সরকার ভর্তুকি দিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
অবৈধ মজুদ ও পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা
প্রতিমন্ত্রী সংসদে বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদন তুলে ধরে জানান, পাবনা, নাটোর ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে অসাধু চক্র অবৈধভাবে তেল মজুদ করছে। তিনি বলেন, কোথাও পানির ট্যাংকে, আবার কোথাও মাটির নিচে ১০ হাজার লিটার পর্যন্ত ডিজেল মজুদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি অ্যাম্বুলেন্সে করেও তেল পাচারের চেষ্টা চলছে। এসব চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : ‘ফুয়েল পাস’
জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ চালু করেছে, যা পর্যায়ক্রমে সারা দেশে কার্যকর করা হবে। প্রতিমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার গঠনমূলক সমালোচনার প্রশংসা করে বলেন, জ্বালানি সঙ্কট কোনো বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর বিষয় নয়, এটি সম্মিলিতভাবে সমাধানের বিষয়। আপনাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে আমরা তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তিনি এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বিরোধীদলীয় নেতা ও তার টিমকে মন্ত্রণালয়ে আমন্ত্রণ জানান।
অধিবেশন শেষে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম জানান, জনগণের স্বার্থ ও কৃষকের ভর্তুকি নিশ্চিত করতে সরকার ও বিরোধী দল- উভয়কেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বুধবার সন্ধ্যায় কার্যপ্রণালী-বিধির ৬৮ বিধি অনুসারে বিরোধীদলীয় নেতার দেয়া নোটিশের ওপর সংসদে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সংঘর্ষ নিয়ে সংসদে তুমুল হট্টগোল
চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ছাত্রদলের ওপর হামলা এবং দেয়ালে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখাকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের সদস্যদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও বাদানুবাদ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্যের ‘হুমকিধর্মী’ বক্তব্যের প্রতিবাদে বিরোধীদলীয় নেতা প্রশ্ন তুলেছেন- তিনি কি জনগণকে উসকানি দিচ্ছেন?
বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া এই উত্তেজনার সূত্রপাত করেন।
আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়ার বক্তব্য ও হুঁশিয়ারি
বক্তব্যের শুরুতে আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, সরকারকে নাজেহাল করতে বিরোধীদল চক্রান্ত চালাচ্ছে। তিনি বলেন, বিরোধীদলের সদস্যরা সংসদে যে আচরণ দেখাচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে তারা আগামী দিনে বাংলাদেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি করতে দেবে না।
চট্টগ্রামের ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গতকাল চট্টগ্রামের সিটি কলেজে ছাত্রদলের ওপর হামলা হয়েছে। ছাত্রদলের অপরাধ ছিল তারা দেয়ালে ‘গুপ্ত’ শব্দটি লিখেছে। এই একটি শব্দকে কেন্দ্র করে হামলা চালিয়ে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানা হয়েছে। যারা হামলা করেছে তারা মূলত ‘গুপ্ত’ হিসেবে কাজ করছে। বিরোধীদলকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি আরো বলেন, আমাদের যারা ভোট দিয়েছে তারা আঙুল চুষবে না, বসে থাকবে না। তারা প্রতিবাদ করবে। সরকারকে সাহায্য করুন, ফ্যাসিবাদের মতো দেশ অস্থিতিশীল করবেন না।
বিরোধীদলের পাল্টা অভিযোগ ও হট্টগোল
সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের এমন বক্তব্যে সংসদে হইচই শুরু হয়। এ সময় সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের এমপি রফিকুল ইসলাম খান দাঁড়িয়ে বলেন, আমরা তো দোষীদের বিচার চেয়েছি। কারা দোষী তা তো প্রকাশ্যেই এসেছে, বিচার করলেই হয়। চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এ সময় একটি পত্রিকা উঁচিয়ে ধরে সংঘর্ষে লিপ্ত অস্ত্রধারীদের ছবি দেখিয়ে প্রমাণের দাবি জানান। তবে মাইক না থাকায় তাদের সব কথা স্পষ্ট শোনা যায়নি।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্য যেভাবে হুমকির ভাষায় কথা বললেন, তাতে আমরা ব্যথিত। তিনি কি জনগণকে উসকানি দিচ্ছেন? এগুলো সংসদীয় আচরণ নয়। এখানে যে অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তা এক্সপাঞ্জ (কার্যবিবরণী থেকে বাদ) করা হোক।
স্পিকারের রুলিং
উভয়পক্ষের উত্তেজনার মুখে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম বলেন, আমরা বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখব। যদি কোনো অসংসদীয় শব্দ থাকে তবে তা এক্সপাঞ্জ করা হবে। তবে রাজনীতিতে ‘আমরা চুপ করে থাকব না’- এসব কথা রাজনীতিবিদরা শত বছর ধরে বলে আসছেন। আপনারা বক্তব্যের মাধ্যমেই এর জবাব দিন, কিন্তু অধিবেশনে বিশৃঙ্খলা করবেন না।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় আরো অংশ নেন রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: আব্দুল বারী সরদার, বগুড়া-৩ আসনের মো: আব্দুল মহিত তালুকদার, যশোর-৬ আসনের মো: মোক্তার আলী, জামালপুর-২ আসনের এ ই সুলতান মাহমুদ বাবু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের মো: কেরামত আলী, ফেনী-২ আসনের জয়নাল আবেদীন, সাতক্ষীরা-৩ আসনের হাফেজ মো: রবিউল বাশার, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের আমিরুল ইসলাম খান, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল এবং রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান।



