আরফাত বিপ্লব চট্টগ্রাম ব্যুরো
রায় হলেও তা কার্যকরের কোনো আলামত দেখছে না জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ ইসমামুল হকের পরিবার। এ প্রসঙ্গে গতকাল শহীদ ইসমামের পরিবারের সাথে কথা হয় নয়া দিগন্তের। দু’টি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন তারা। বলছেন, জুলাই আন্দোলনে নিহত সব শহীদকে সমমর্যাদা দেয়া হয় না। যেটা অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে ছিল। ইসমামের মা শাহেদা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে আর ফিরে পাব না। আমার ছেলে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। তবে ইতোমধ্যে বিচারের রায় হলেও তা কার্যকরের কোনা চিহ্ন দেখছি না। আমি চাই আমার ছেলে ইসমামসহ সব শহীদের খুনীদের বিচার হোক। একটা দৃষ্টান্ত তৈরি হোক, আর কোনা মায়ের বুক যাতে খালি না হয়।
শহীদ ইসমামের ভাই মুহিবুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, আগে সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবে যোগাযোগ রাখা হতো এখন সেটা আর ওভাবে হয় না। কোনো অনুষ্ঠান থাকলে জাস্ট হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জানিয়ে দেয়া হয়। দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন হয়েছিল স্বৈরাচারের পতনের জন্য। কেউ তখন দল-মত দেখেনি। খুনী সরকারের বিরুদ্ধে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন শহীদদের মধ্যে বৈষম্য করা হচ্ছে। সরকারদলীয় শহীদ হিসেবে চিহ্নিত করে কাউকে কাউকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হচ্ছে আর কাউকে কাউকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আর্জি জানাতে চাই, এ ধরনের বৈষম্য যাতে না হয়। একই সাথে শহীদ ইসমামসহ সব শহীদের খুিনদের বিদেশ থেকে এনে রায় কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
শহীদ ইসমামের মা শাহেদা বেগম এখনো ছেলের জন্য কাঁদেন। বিশেষ করে একটি আক্ষেপ তাকে কখনো শান্তিতে থাকতে দেয় না। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইসমাম বারবার একটু পানি খেতে চেয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসকের নিষেধ থাকায় মা তাকে পানি খাওয়াতে পারেননি। সেই মুহূর্তটার কথা মনে হলেই মা ভেঙে পড়েন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার ছেলে শেষবার একটু পানি চেয়েছিল, কিন্তু আমি নিজের হাতে তাকে এক ফোঁটা পানিও খাওয়াতে পারিনি।’ এই আক্ষেপ তিনি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন। দুই বছর সময় পেরিয়ে গেলেও এই কষ্ট, এই অপরাধবোধ আর সন্তানের শূন্যতা মুছে যায়নি।
প্রসঙ্গত, শহীদ ইসমামুল হক চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার দক্ষিণ সাতকানিয়া গোলামবারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অল্পবয়সে পিতাকে হারিয়েছিল সে। জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে পরিবারের আর্থিক দৈন্যতার কারণে একটা দোকানে চাকরি নিতে সে ঢাকায় যায়। সেখানেই সে গুলিবিদ্ধ হয়।
২৪ সালের স্মৃতিচারণ করে মুহিবুল হক জানান, ৯ বছর আগে আমার আব্বা মারা যান। আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক। আমার ছোটভাই ইশমাম ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়। কোমরের একটু উপরে পেছন দিক থেকে গুলি ঢুকে পেট ভেদ করে বেরিয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্ষক্ষরণের কারণে ৭ আগস্ট আমার ভাই মারা যায়।
‘দেশকে জালিমমুক্ত করতে শাহাদত বরণ করার জন্য যাচ্ছি।’
প্রতিদিন সকালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মিছিলে যাবার সময় ম্যাসের অন্যদের বলতো, ‘দেশকে জালিমমুক্ত করতে শাহাদত বরণ করার জন্য যাচ্ছি।’ মহান আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ করেছেন। ২৪ সালে শহীদ ইসমামুল হকের জানাজাপূর্ব সমাবেশে এই কথাগুলো বলেছিলেন সে যেখানে পার্টটাইম চাকরি করতো সেই দোকানের মালিক।
২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। কয়েকদিন পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফসাপোর্টে নেয়া হয়। ৭ আগস্ট ইসমাম শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করে। ইসমাম লোহাগাড়ার দর্জিপাড়ার মরহুম মো: নুরুল হকের পুত্র।



