নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মো: আমিনুল ইসলাম। গতকাল সোমবার বেলা ২টা ২০ মিনিটের দিকে বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। এর আগে একই দিন সকালে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর অনুবিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে মো: আমিনুল ইসলামকে নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন জারির পর বেলা ২টার কিছু সময় পর ট্রাইব্যুনালে পৌঁছান আমিনুল ইসলাম এবং সরাসরি চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে যান। এ সময় নিজ আসনে আসীন তাজুল ইসলাম দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানান। উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে তাজুল ইসলাম বলেন ‘আমি সত্যিই খুব আনন্দিত। আমিন ভাইয়ের সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক; আমরা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি আজকের প্রেস ব্রিফিংয়েও বলেছি যে, নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে আমি স্বাগত জানাই। আমি আশা করি, তিনি আমাদের চেয়েও বেশি দক্ষতার সাথে ট্রাইব্যুনাল পরিচালনা করবেন। তার যেকোনো ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা পাশে থাকব। আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে যেকোনো সাহায্য বা পরামর্শের জন্য যখনই আমাকে ডাকবেন, ইনশাআল্লাহ আমি তার পাশে থাকব।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘নতুন চিফ প্রসিকিউটরের সাফল্য কামনা করছি। আমরা একই পেশায় থাকায় সুপ্রিম কোর্টে আমাদের নিয়মিত দেখা হবে। আমাদের হৃদ্যতা ও ভালোবাসা অটুট থাকবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। সরকার ও জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন, তিনি তা পূরণে সক্ষম হবেন এটাই আমাদের কাম্য।’ এরপর তাজুল ইসলামের উপস্থিতিতেই যোগদান সংক্রান্ত নথিপত্রে স্বাক্ষর করেন আমিনুল ইসলাম। এ সময় প্রসিকিউশনের প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বে থাকা গাজী এইচ এম তামীম তাকে সহযোগিতা করেন এবং পাশে উপবিষ্ট ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাজুল ইসলাম তাকে চিফ প্রসিকিউটরের আসনে বসিয়ে দিয়ে নিজে সামনের চেয়ারে গিয়ে বসেন। এ সময় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা আমিনুল ইসলামকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে ভিড় করলে তিনি তাজুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে কিছুটা কুণ্ঠিত স্বরে বলেন, ‘রাজনৈতিক নিয়োগ তো, তাই একটু...’। তাজুল ইসলাম তখন হাত উঁচিয়ে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে হাসিমুখে সম্মতি জানান।
ওখান থেকে আমিনুল ইসলামকে সাথে নিয়ে রেজিস্টারের কার্যালয়ে যান তাজুল। ওখান থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের প্রাপ্য সাজা পেতে হবে। তিনি বলেন, আজ আমি দায়িত্ব পেলাম। এই ট্রাইব্যুনালের সব কার্যক্রম দেখব। তবে একটা কথা বলতে চাই যে, যেসব অপরাধী বিচারের সম্মুখীন তাদের জন্য সুস্পষ্ট বার্তা হলো যারা কোনো অন্যায় করেননি, তারা প্রসিকিউশনের মাধ্যমে কোনো হয়রানির শিকার হবেন না। কিন্তু যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের বার্তা দিতে চাই যে, তাদের প্রাপ্য সাজা পেতে হবে। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বভার গ্রহণের পর মনে হয়েছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী নিজের কর্তব্য যেন পালন করতে পারি, সে চেষ্টা করব। একই সাথে দক্ষতা, মেধা ও জ্ঞান দিয়ে মামলাগুলো পরিচালনা করার চেষ্টা করব। এজন্য সবার সহযোগিতা চাই। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কারো প্রতি কোনো বিদ্বেষমূলক মনোভাব পোষণ না করে আইনের প্রত্যাশা অনুযায়ী এই বিচারকার্য পরিচালনা হবে। আমাদের মাধ্যমে কারো প্রতি কোনো বিদ্বেষ থাকবে না। বিচারের গতি আরো বাড়ার প্রত্যাশা রেখে আমিনুল ইসলাম বলেন, চলমান বিচারের গতি কমার সুযোগ নেই। বরং প্রসিকিউশনের মাধ্যমে এ গতি আরো বাড়বে। কারণ দেশের গতি বাড়ানোর জন্যই ক্ষমতায় এসেছে দলীয় সরকার।
এদিন সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে অপসারণের বিষয়টিকে ‘স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া’ বলে মনে করছেন সদ্য বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘যখন একটি নির্বাচিত সরকার আসে, তারা স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের পছন্দনীয় লোক বসায়; এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’ এ সময় নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি ১৭ মাস আগে দায়িত্ব নেয়ার সময়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের বিষয়েও কথা বলেন তিনি। প্রসিকিউশন টিমের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে, টিমে বিভক্তি নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন সদ্য বিদায়ী এই চিফ প্রসিকিউটর।
‘অভিজ্ঞতা অম্ল-মধুর’ : প্রায় ১৭ মাস দায়িত্ব পালনের পর বিদায়বেলায় নিজের অনুভূতি ‘অম্ল-মধুর’ বলে উল্লেখ করেন সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরুতে দায়িত্ব নেয়ার প্রেক্ষাপট স্মরণ করে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আজকে আমার অনুভূতিটা অম্ল-মধুর। বাংলাদেশের একটা কঠিন সময়ে আমি এখানে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলাম।’ দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্ব নিই, আপনারা জানেন যে এই মূল ভবনটি তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। একটা টিনশেডে কার্যক্রম চলছিল। তার আগের প্রসিকিউশনে যারা ছিলেন, তারা সব কিছু এলোমেলো রেখে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বইপত্র, নথিপত্র বৃষ্টিতে ভিজছিল, এ রকম একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম। সেই পরিস্থিতি থেকে হাসপাতালগুলোতে ছুটে গিয়ে আহতদের কাছ থেকে আলামত সংগ্রহ এবং গুমের তদন্ত এগিয়ে নেয়া হয়।’
ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন ও সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, শহীদ পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী এবং ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে শুভেচ্ছা : নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে স্বাগত জানিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমার প্রথম রি-অ্যাকশন হচ্ছে- আমি নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে স্বাগতম জানাই। তার প্রতি আমার শুভেচ্ছা থাকবে। তিনি যাতে আমাদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত দায়িত্ব পালনে সফল হন।’ আগে থেকে আভাস পেলেও নিজে কেন পদত্যাগ করেননি, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে তাকে আগে বলা হয়েছিল যে সব কিছু এভাবেই চলবে। তবে রোববার তাকে নতুন কাউকে স্থলাভিষিক্ত করার ধারণার কথা জানানো হয়। তাজুল ইসলাম বলেন, ‘তখন আমি নিজে থেকে বলেছিলাম যে তাহলে কি আপনারা চাচ্ছেন যে আমি পদত্যাগ করে চলে যাব? বলেছেন, না দরকার নাই। কারণ হচ্ছে যে ন্যাচারাল প্রক্রিয়াতে রিপ্লেসড হবে। আননেসেসারি পদত্যাগ করার দরকার নেই। সে কারণে আমি মনে করেছি যে পদত্যাগ করা কোনো যুক্তিযুক্ত নয়।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘এটা অস্বাভাবিক আমি মনে করছি না। এটা খুবই স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া। পদত্যাগ করলে এটা ভিন্ন বার্তা যেতে পারত।’
‘যা কিছু হয়েছে, ট্রান্সপারেন্ট’ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিমের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চান এক সাংবাদিক। জবাবে তাজুল ইসলাম জানান, ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে করা এসব অভিযোগ তিনি আমলে নিচ্ছেন না।
তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত হিংসা চরিতার্থ করার জন্য যদি কেউ এই ধরনের কথা বলে, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ এইখানে ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়াতে যা কিছু হয়েছে ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ)। বাংলাদেশের গোটা জনগণ সাক্ষী, মিডিয়া সাক্ষী।’
প্রসিকিউশন টিমে কোনো ‘গ্রুপিং’ বা ‘দলাদলি’ রয়েছে কি না- এমন অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দেন তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, কাজের সুবিধার্থে নির্দিষ্ট মামলার ভিত্তিতে প্রসিকিউটরদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। সদ্য বিদায়ী এই চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘প্রসিকিউশন অফিসে কোনো গ্রুপিং নেই। আমাদের গ্রুপ ছিল কাজের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার মামলার জন্য তিনজন প্রসিকিউটরের গ্রুপ, চানখারপুলের জন্য তিনজন, আশুলিয়ার জন্য গ্রুপ। দ্যাট ওয়াজ দ্য গ্রুপ।’
পুরনো পেশায় ফিরবেন তাজুল ইসলাম : বিদায়বেলায় নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, তিনি তার পুরনো পেশায় ফিরে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমার মূল পরিচয় আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। সুতরাং আমার জায়গা হচ্ছে আইন পেশা। আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আমার স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফেরত যাব। আমি তো একদিনের জন্য বেকার থাকছি না। আপাতত কোনো পদে যাচ্ছি না।’
এর আগে সোমবারই তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটর পদে আইনজীবী মো: আমিনুল ইসলামকে নিয়োগ দেয় সরকার। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলামের পৈতৃক নিবাস হবিগঞ্জ জেলায়। তিনি ১৯৯৩ সালের ২৭ মে হাইকোর্ট বিভাগে এবং ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
অন্য দিকে, সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনজীবী হিসেবে আইনি লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তাকে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।


