সাহিত্য কবিতা গুলি

Printed Edition
সাহিত্য কবিতা গুলি
সাহিত্য কবিতা গুলি

তমিজ উদ্দীন লোদী

নূহের নৌকা

পানি নামল শেষে।

পায়রাটা ফিরে এলো জলপাইয়ের পাতাসহ

প্রকৃতিও জানাল সন্তোষ রংধনু হয়ে ঝুলে রইল মেঘের গায়ে।

কিন্তু নূহ স্থলভাগে পা রাখলেন না তখনো

কেবিনের ভেতর থেকে শুনতে পেলেন

জোড়ায় জোড়ায় নামা জীবজন্তুর পায়ের শব্দ-

সিংহীর গর্জনের সাথে মিশে গেছে মশার গুঞ্জন,

হরিণী শুঁকছে কচ্ছপের আর্দ্র খোলস।

নূহ ভাবলেন, তাহলে কি এই নৌকাই আদি বাস্ত?

এই আর্দ্র কাঠের গন্ধ, পচা খড় আর বিষ্ঠার গন্ধ?

যেখানে হিংস্র আর শান্ত একই পাত্রে পানি পান করে

যেখানে ভালোবাসা আর আহার পরস্পরকে স্পর্শ করে

বাইরের পৃথিবীটা দেখতে লাগছে এখন

একটা বিশাল মিথ্যের মতো-

যেখানে ডুবে গেছে তার চেনা সব মুখ

যেখানে বাড়িঘর ডুবে গেছে নির্বিবাদে

যেখানে রংধনু দেখতে দেখতে

হয়ে পড়েছে নিছক আলোর প্রতিসরণ।

তিনি জানেন না, তিনি কি এই নোংরামি,

এই গন্ধ, এই সঙ্কটের কবি?

নাকি কোনো এক প্রাচীন সভ্যতার শেষ প্রতœতাত্ত্বিক

যে শুধু খুঁজে ফেরে ডুবে যাওয়া দিনগুলোর হাড়?

পুত্রের কথা মনে পড়ে তার

সে ঢেউয়ের সাথে তর্ক করছিল

সে পানিকে ডেকেছিল বাবা বলে

পানিরও বুঝি কোনো উত্তর ছিল না

শুধু শুয়েছিল নিষ্পাপ, নিশ্চুপ, মৌন।

নূহ বুঝতে পারেন, এখন তার সামনে প্রশ্ন নয়

শুধু পানি। পানি। পানি। আর এই নৌকা, জাহাজ,

সিন্দুক, কিংবা যাই হোক না কেন-

ভেসে বেড়াচ্ছে সময়ের একেবারে মাঝখানে

নোঙর ফেলার সাহস পাচ্ছে না কোথাও।

স্থলভাগ থেকে হঠাৎ উঠে আসে

পোড়া মাটি আর লবণের গন্ধ।

কোনো এক নিভে যাওয়া গ্রাম থেকে

ভেসে আসে কুকুরের ডাক।

নূহ ভেবেছিলেন পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে

কিন্তু কুকুরটা ডেকে চলল বারবার।

নূহ শুনলেন সেটাকে, আর মনে পড়ল-

আল্লাহ তো কিছুই শেষ করেন না

শুধু শুরু করেন নতুন করে হিসেব রাখা।


আশরাফ হাসান

পাখিদের ভাষাতৃষ্ণা

পৃথিবীর সকল সংসদীয় ফ্লোর যখন

আমার জন্যে বন্ধ হয়ে যায়

তখন মার্ক জুকারবার্গের ডিজিটাল সোশ্যাল হাউজ নিউইয়র্ক টাইমসের ওপিনিয়ন ফোরাম

ওয়াশিংটন পোস্টের পোস্ট এডিটোরিয়াল

গার্ডিয়ানের অভিভাবক স্পেস-এ

কিংবা ক্যামব্রিজ হলের পোয়েটিক বারান্দায় দাঁড়িয়ে লাউড স্পিকারে ছড়িয়ে দিই কবিতার ভলিউম

আসহাবে কাহাফের মতো হাজার বছর ঘুমোনোর পর যখন দেখতে চাইলাম রোদ ও পূর্ণিমার আকাশ মৃতত্রাস মনে করে ডাইনোসরের ফসিল

তুলে আনতে চাইলাম ইতিহাসের পাঠকক্ষে

তখনো তুমি কবিতার বিরুদ্ধে স্লোগান উচ্চকিত করতে থাকলে সশব্দ গানের পাণ্ডুলিপিকে হৃদয়-দখলি দলিল ভেবে রাতজাগা ডাহুক কিংবা কোকিলের বিষণœতাকে হত্যা করতে চাইলে

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো কবিতার উপমায় লেপ্টে দিতে চাইলে প্রতিহিংসার অপবাদ

অথচ আমি শুধু আটলান্টিকের নিভৃত পাড়ে দাঁড়িয়ে পাখিদের চিরায়ত ভাষাতৃষ্ণাকে উসকে দিতে চেয়েছি

গোয়েবলসিয় নগ্ন নচিকেতায় বেঁধে দিতে চেয়েছি

আসহাবে জবানের অবরুদ্ধ প্রেমপঙ্ক্তি

পৃথিবীর সব কমন হাউজ যখন আমার প্রবেশাধিকার অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে

তখন আমি উৎপ্রেক্ষার শাণিত কোমল ফলা বিছিয়ে দিই বোবা পৃথিবীর সারি সারি নীল চেম্বারে, আর বাক-প্রতিবন্ধী ইমার্জেন্সি বেড-কভারে

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

হাদি মানে বিপ্লব

হে হাদি

তুমি সাইক্লোন তুমি ভূমিকম্প

তোমার স্থান তুমি করে নিয়েছ

জান্নাতে তোমার উঁচু স্থান,

তোমাকে স্মরে কোটি জনতা

তোমাকে ধারণ করে আমজনতা

তুমি শুধু হাদি নও তুমি এক মহাবিপ্লব।

জাতি জানতে শিখেছে

এক মহা বিপ্লবের নাম শরিফ ওসমান হাদি।


রি হোসাইন

মাতাল ওড়াউড়ি

তুমি তুখোড় উড়াও ঘুড়ি,

একটা স্বপ্নমাখা ঘুড়ি;

তোমার ঘুড়ির আমি একটি

এক মাতাল ওড়াউড়ি।

আকাশজুড়ে তোমার হাতের

নিপুণ টানের খেলা,

আমি কেবল ছন্দ খুঁজি

সারা বিকালবেলা।

নেশার মতো আকাশজুড়ে

চক্রাকার ওই ঘোর,

আমি তো এক অবাধ্য টান

ছিঁড়তে চাওয়া ডোর।

নাটাই যখন দিচ্ছে ঝাপটা

বুকের পাঁজরজুড়ে,

আমি তখন হচ্ছি যে ছাই

তোমার মেঘের পুরে।

উথালপাথাল হাওয়ার তোড়ে

উড়ে যাই দিশাহীন,

তোমার মায়ায় বন্দী হয়েও

আমি দুরন্ত স্বাধীন।

গুটিয়ে নিও না নাটাইখানি

পর করো না ঘুড়ি;

তোমার টানেই সার্থক হোক

মাতোয়ারা ওড়াউড়ি।

নাটাইভরা মায়ার সুতায়

বেঁধেই রেখো আমায়;

তোমার আপন আকাশটাতে

জীবন-পরান জুড়ায়।


সারমিন চৌধুরী

বোবাফুলের বুক

উজাড় করে দিয়ে নিজের সর্বোচ্চ

প্রেমহীন ভিখারির মরতা ঘুরি দিকবিদিক

নিজ ছায়ার দৈর্ঘ্যে লুকিয়ে রাখি বুনো দুঃখ

বিকালে হৃদয়ে উঠলে ঝরাপাতার শোক,

আমি ব্যথার দীর্ঘতা বলেছি অস্তগামী সূর্যকে

চেয়েছি একমুঠো রোদ শুকাতে ভিতরকার ঘা।

কিন্তু নিষ্ঠুর সময় কৌশলে ঘুরিয়ে দিলো দিক

ভাঙা হাঁটুর মত অকেজো করে অনুভূতিকে

শস্যদানার মতো ছড়িয়ে দিলো ঘোর অন্ধকার।

শুনে শেষ ট্রেনের হুইসেলের বিবিধ সন্ত্রাস,

অজানা ভয়ে মোচড়ে উঠে জৈবিক সত্তা,

ছোটাছুটি করছে এদিকসেদিক জোনাকিরা,

সেখানে আনন্দের তাণ্ডব চালাই পৈশাচ,

আর আমি দুঃখের মাদুরে কাত চিত হয়।

সময়ের বিমর্ষ স্রোতে ভেসে গিয়ে প্রেমপদ্ম!

দিয়ে গেছে অনারোগ্য ব্যাধি মনে, যেখানে

লকলকিয়ে বাড়ে একাকিত্বের মহীরুহ;

ব্যথার ভারে নুয়ে পড়ে বোবাফুলের বুক।