মুছাপুর রেগুলেটর বিকল

ফেনী নদী গিলে খাচ্ছে ৩ উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ

Printed Edition
ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন সোনাগাজী ইউএনও রিগান চাকমা  : নয়া দিগন্ত
ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন সোনাগাজী ইউএনও রিগান চাকমা : নয়া দিগন্ত

সাইফুল আলম হিরন সোনাগাজী (ফেনী)

মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ার পর ফেনীর সোনাগাজী, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও ফেনীর দাগনভূঞা এই তিন উপজেলার ছোট ফেনী নদী পাড়ের বিস্তীর্ণ জনপদ ভাঙনের কবলে পড়েছে। প্রতিদিন নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির। ভাঙনের পাশাপাশি জোয়ারে সাগরের লোনা পানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে তিন ফসলি জমি। ভাঙন ও লবণাক্ততায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উপকূলের মানুষ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সোনাগাজীর চর দরবেশ ইউনিয়নসংলগ্ন ছোট ফেনী নদীতে নির্মিত মুছাপুর রেগুলেটরটি দীর্ঘ দিন ধরে নদীভাঙন রোধ, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং ফেনী-নোয়াখালীর উপকূলীয় জনপদ ও ফসলি জমি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ২৩ ভেন্টবিশিষ্ট এ রেগুলেটর দিয়ে ছোট ফেনী নদীর পানি বঙ্গোপসাগরে নিষ্কাশন হতো। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও উজানের পানির চাপে রেগুলেটরটি ভেঙে পড়ে। এরপর থেকেই এটি অকার্যকর হয়ে আছে। ভেঙে যায় রেগুলেটরের সংযোগসেতুও।

সরেজমিন দেখা যায়, সোনাগাজীর চর দরবেশ, চর চান্দিয়া ও চর মজলিশপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোম্পানীগঞ্জের পূর্বাংশ ও দাগনভূঞার দক্ষিণাঞ্চল। নদীর পাড়ঘেঁষা বহু ঘরবাড়ি ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে। কোথাও কোথাও নদী গিলে খাচ্ছে সড়ক। ভাঙনের মুখে রয়েছে বাজার, মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

একই সাথে লোনা পানির ভয়াবহতায় বিপর্যস্ত কৃষি। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, জোয়ারের সময় নদীর লবণাক্ত পানি খাল দিয়ে মাঠে ঢুকে পড়ছে। এতে হাজার হাজার হেক্টর তিন ফসলি জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে। ধান, শাকসবজিসহ নানাবিধ ফসল আর আগের মতো ফলছে না। ফলে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

কাজীরহাট বাঁশবাজার এলাকার বাসিন্দা হানিফ বলেন, অল্প কয়েক গজ দূরত্বে তার বসতঘরের অবস্থান। যেকোনো সময় ঘরটি নদীতে তলিয়ে যেতে পারে। চর দরবেশ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, মানুষের কান্নায় এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে। বহু বাড়িঘর নদীতে চলে গেছে। অন্তত জিওব্যাগ ফেলে জরুরি সুরক্ষা দিলে কিছু ঘরবাড়ি রক্ষা পাবে। চর চান্দিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ফেনী জেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন খোকন বলেন, উপকূলের মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে দিশেহারা। দ্রুত মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ না হলে ক্ষতি আরো বাড়বে। অব্যাহত নদী ভাঙনে উপকূলের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, রেগুলেটর পুনর্নির্মণের দাবিতে একাধিক মানববন্ধন ও কর্মসূচি হলেও কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ভাঙন ঠেকাতে কিছু জিওব্যাগ ফেলা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বরং ভাঙন আরো তীব্র হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আবু মুসা রকি বলেন, মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ভাঙন বেড়েছে। জরুরি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রতিনিয়তই পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে। জিওব্যাগ ফেলে অস্থায়ী সুরক্ষার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাইন উদ্দিন আহমেদ সোহাগ বলেন, রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ার পর জোয়ার-ভাটার লোনা পানি কৃষিজমিতে ঢুকে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ভাঙনে কৃষি জমি বিলীন হচ্ছে।

ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ভেঙে যাওয়া মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণে সরকার প্রকল্প নিয়েছে। এটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তিন উপজেলার মানুষ ভাঙন ও লবণাক্ততার দুর্ভোগ থেকে অনেকটা রক্ষা পাবে। আমরা সাময়িক উপশমের জন্য নদী শাসন ব্যবস্থায় কিছু জিওব্যাগ ফেলেছি, প্রয়োজনে আরো ফেলা হবে।