হিটস্ট্রোকে থেমে গেল মেধাবী ফাহিমের জীবন

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

আমিমুল এহসান ফাহিম। ২৬ বছরের টগবগে এক তরুণ। অনার্স সম্পন্ন করেছেন আর্ন্তজাতিক ইসলামি বিশ^বিদ্যালয় চট্টগ্রামের ফার্মেসি ডিপার্টমেন্ট থেকে। মাস্টার্স ইউএসটিসি থেকে। মঙ্গলবার ঈদের ছুটি কাটিয়ে ফেরার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। ব্যাগ গুছিয়ে শহরের পথে রওয়ানা হন। এমন সময় হঠাৎ শরীরে তীব্র অস্বস্তি। লোকজন ধরাধরি করে প্রথমে স্থানীয় ক্লিনিকে, পরে চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। থেমে যায় একটি জীবন। সাথে মৃত্যু ঘটে একবুক স্বপ্নের। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে যথাযথ চিকিৎসা পায়নি ফাহিম।

ফাহিমের গ্রামের বাড়ি নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নে। তারা দুই ভাই এক বোন। তাদের বাবা স্থানীয় ফাজিল মাদরাসার সহকারী অধ্যাপক। ফাহিম থাকতেন চট্টগ্রাম নগরীতে। মেধাবী ও কর্মঠ এই তরুণ পড়াশোনা ও ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি ইসলামি সাংস্কৃতিক কর্মতাণ্ডের সাথেও যুক্ত ছিলেন। ইসলামী সঙ্গীত গেয়ে জয় করে নিতে পারতেন শ্রোতাদের হৃদয়।

মঙ্গলবার (২ জুন) রাত সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম প্যারেড মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তার প্রথম জানাজা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপুল জনসমাগম ঘটে। একে একে ছুটে আসতে থাকেন তার সহপাঠী, বন্ধু ও শুভাকাক্সক্ষীরা। শেষবারের মতো তাকে দেখতে আসা মানুষের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

ফাহিম একটা বাসায় পড়াতেন। সেই বাসার গৃহকর্তা একটা খামে মে মাসের টাকা নিয়ে ঘুরছিলেন। সাথে তিন শিশু। ফাহিমের ছাত্ররা শেষবারের মতো প্রিয় স্যারকে বিদায় দিতে এসে তারাও বাকরুদ্ধ। এ এক বেদনাবিধুর পরিবেশ। জানাজাপূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখের চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াত আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী, ন্যাশনাল হাসপাতালের পরিচালক ডা: আবু নাসের, সাবেক ছাত্রনেতা ড. আ ম ম মসরুর হোসাইন ও চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর শিবির সভাপতি মুমিনুল হক প্রমুখ। একেকজন বক্তা ফাহিমের স্মৃতি বর্ণণা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ফাহিমের একমাত্র ছোট ভাই মোকাররম হোসাইন শামিমও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শামিম নয়া দিগন্তকে জানান, ‘আমার বড়ভাই গত ২৩ মে ঢাকায় একটা ওষুধ কোম্পানিতে ভাইভা দিয়ে এসেছে। হয়তো দুয়েকদিনের মধ্যেই জয়েনিং লেটার আসবে। কিন্তু মহান আল্লাহর হুকুমে তিনি আর আমাদের মাঝে নেই।’

গ্রামের বাড়িতে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন ফাহিমের মা উম্মুল খাইর। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বারবার বেহুঁশ হচ্ছেন। পরিবারের বড়ছেলেকে নিয়ে অন্য সব মায়ের মতো তারও অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বিধি বাম। উম্মুল খাইরের চোখে এখন ঘোর অমানিষা।

নির্বাক হয়ে গেছে ফাহিমের একমাত্র বোন নুসরাত হোসাইন ওমাইরা। সে স্থানীয় মাদরাসায় আলিমের শিক্ষার্থী। একটি অনাকাক্সিক্ষত হিটস্ট্রোক একটা সাজানো গোছানো পরিবারে নামিয়ে আনল বিষাদের ছায়া। বদরখালী গ্রামের কলেজ পাড়ার মাওলানা ফিরোজ আলম হোসাইনের বাড়িতে এখন সুনসান নীরবতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাহিমের বন্ধুদের দেয়া বেদনাবিধুর স্ট্যাটাসে অনেকেরই হৃদয় ঘেমে আসে। সবারই প্রার্থণা, মহান আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।