- উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসারদের কারসাজি ফাঁস
- মাঠের তথ্যের সাথে মনিটরিং টীমের রিপোর্টের ফারাক
- তালিকা পুনঃযাচাইয়ে শিক্ষামন্ত্রীর ফের আলটিমেটাম
প্রয়োজনের অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাহিদা দেখিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) শত কোটি টাকার জালিয়াতি ধরা পড়েছে। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে তো বটেই খোদ ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ৪০ শতাংশ চাহিদা নিয়েও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার সরকারি ছুটির দিনেও শিক্ষামন্ত্রী নিজেই এনসিটিবির কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন জেলা উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের নিয়ে বৈঠক করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কয়েক দফা সতর্ক করেও জেলা উপজেলা থেকে এখনো পাঠ্যবইয়ের সঠিক চাহিদা না পেয়ে এখন সর্বশেষ আগামী তিন দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে সময় বেঁধে দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নিজেই। অর্থাৎ আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য দেশে বিভিন্ন স্কুল মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য মোট কতগুলো বইয়ের প্রয়োজন হবে শ্রেণিভিত্তিক তার সঠিক হিসাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার জন্য এনসিটিবি এবং জেলা উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের নির্দেশ দিয়েছেন। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য দেশে মোট প্রায় ৩০ কোটি বইয়ের চাহিদা ছিল (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে)। এ বছর সেই চাহিদা এক কোটি কমেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে সঠিক হিসাব মাঠপর্যায় থেকে তুলে আনতে পারলে এই বইয়ের পরিমাণ ২৮ কোটি বা এর চেয়ে কম হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বিগত দিনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাহিদা দিয়ে সেই অনুপাতে পাঠ্যবই উপজেলা কিংবা জেলায় পাঠাতে এনসিটিবিকে বাধ্য করত শিক্ষা অফিসারদের একটি সিন্ডিকেট। বিগত আওয়ামী আমলে এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী বেপরোয়া ছিল যে, উপরের দোহাই দিয়ে তারা ধরাকে সরাজ্ঞান করে চলত। এমনো অভিযোগ ছিল যে, পাঠ্যবই না ছাপিয়েই এনসিটিবির একটি চক্র শিক্ষা অফিসারদের সাথে যোগসাজশে বই মুদ্রণের অর্থ তুলে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগভাটোয়ারা করে নিয়েছে। কিন্তু এবার শিক্ষা অফিসারদের সেই গোমর ফাঁস হয়ে গেছে। সূত্র জানায়, গত মার্চ মাসে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে পাঠ্যবইয়ের যে তালিকা এনসিটিবি পেয়েছে সেখানে বেশ গরমিল ধরা পড়ে। ফলে এনসিটিবির পক্ষ থেকে আগের সেই তালিকা পুনরায় যাচাই বাছাই করতে ৬৬ জন কর্মকর্তার সমন্বয়ে ৩৪টি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সদস্যরা গত ১৫ এবং ১৬ এপ্রিল একযোগে দেশের ৬৪টি জেলা এবং দৈবচয়নের মাধ্যমে শতাধিক উপজেলায় সরেজমিন পরিদর্শন করে বইয়ের প্রকৃত একটি চাহিদা সংগ্রহ করেছেন। সেই তালিকা এবং আগের মাসের চাহিদার তালিকার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে ৪০ শতাংশ বইয়ের চাহিদায় বড় ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়েছে। অর্থাৎ জেলা ও উপজেলা শিক্ষাকর্মকর্তাদের পাঠানো বইয়ের চাহিদার তালিকা এবং এনসিটিবির কর্মকর্তাদের সংগৃহীত বইয়ের চাহিদার তালিকায় আকাশ-পাতাল ফারাক পরিলক্ষিত হয়েছে। বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের দৃষ্টিগোচর হলে তিনি গতকাল পুনরায় তালিকা যাচাই-বাছাই করতে এবং নতুন করে তালিকা তৈরি করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, বিগত দিনে অনেক কিছুই নিয়ম মেনে হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি সবকিছু একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসার। তিনি বলেন, শুধু পাঠ্যবইয়ের চাহিদার তালিকা তৈরিতেই শত কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। তাই এখন আমরা এনসিটিবিকে নির্দেশনা দিয়েছি যাতে কোনো একটি পয়েন্টেও যাতে অনিয়মের সুযোগ না থাকে। তাই আমরা মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে বইয়ের সঠিক চাহিদা জানার চেষ্টা করছি। সবকিছু হয়তো একসাথে সঠিক জায়গায় এখনি আনা সম্ভব হবে না। তাই বলে কি চেষ্টা করব না?
এনসিটিবি সূত্র জানায়, প্রতি বছর নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানো ও বিতরণে অসাধু চক্রের যোগসাজশে চাহিদায় অতিরিক্ত বইয়ের হিসাব দেখানো বা জালিয়াতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমন দুর্নীতি ঠেকাতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের চাহিদা নিরূপণে এবার আর কেবল কাগুজে তথ্যের ওপর ভরসা না করে সরেজমিন শুরু করেছে যাচাই-বাছাই। এনসিটিবির প্রাথমিক তদন্তে মাঠপর্যায়ের একটি উপজেলার বইয়ের চাহিদায় প্রায় ৪০ শতাংশ জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
সূত্র জানায়, হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর আগের চাহিদায় ৭ হাজার ১৯৫টি বই কথা বললেও যাচাই-বাছাইয়ে চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯০০। সপ্তম শ্রেণীর আগের চাহিদায় ৬ হাজার ৮০০ পরে ৫ হাজার ৫০০, পার্থক্য ১৩০০। অষ্টম শ্রেণীর আগের চাহিদায় ছিল ৫ হাজার ৯৬৫টি পরে ৪ হাজার ৮১০টি, পার্থক্য ১ হাজার ১৫৫। নবম শ্রেণীর আগের চাহিদায় ৪ হাজার ৯৩টি, পরে ৪ হাজার ৪৮০টি, পার্থক্য ৪৫৫ বই। তাতে দেখা যায়, মোট আগে পাঠানো চাহিদা ২৪ হাজার ৮৯৫টি, বর্তমানে পাঠানো চাহিদা অনুযায়ী ২০ হাজার ৬৯০টি। তাতে পার্থক্য দেখা যায় ৪ হাজার ২০৫টি বইয়ের।
একইভাবে ইবতেদায়িতে প্রথম শ্রেণীর আগের চাহিদায় ছিল ১ হাজার ৩৪০টি, পরে এক হাজার। পার্থক্য ৩৪০। দ্বিতীয় শ্রেণীর আগের চাহিদায় ১ হাজার ৩৪০টি, পরে ৯০০, পার্থক্য ৪৪০টি। তৃতীয় শ্রেণীর আগের চাহিদায় ১ হাজার ৩৫০টি, পরে ৯০০, পার্থক্য ৪৫০। চতুর্থ শ্রেণীর আগের চাহিদায় ১ হাজার ৩৫০টি, পরে ৯০০, পার্থক্য ৪৫০। পঞ্চম শ্রেণীর আগের চাহিদায় ছিল ১২০০টি, পরে ৮৫০টি, পার্থক্য ৩৫০টি। মোট পাঠানো চাহিদা ছিল ৬ হাজার ৫৮০টি, বর্তমানে পাঠানো চাহিদা ৪ হাজার ৫৫০টি বই। বইয়ের পার্থক্য ২ হাজার ৩০টি। আবার ৬ষ্ঠ শ্রেণির আগের চাহিদায় ছিল ১ হাজার ৪০০টি, পরে ৮৫০টি, পার্থক্য ৫৫০। সপ্তম শ্রেণীর আগের চাহিদায় ১২০০টি, পরে ৮০০টি, পার্থক্য ৪০০। অষ্টম শ্রেণীর আগের চাহিদায় ১২০০ টি পরে ৮০০টি, পার্থক্য ৪০০। একইভাবে নবম শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ের আগের চাহিদায় ১২০০টি, পরে ৭৫০টি, পার্থক্য ৪৫০টি। মোট পূর্বে পাঠানো পাঠ্যবইয়ের চাহিদা ৫ হাজার, বর্তমানে পাঠানো চাহিদা ৩ হাজার ২০০, পার্থক্য ১ হাজার ৮০০টি। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ১ কোটি বই বেশি ছাপার চাহিদাপত্র দেয়া হয়েছে।
ঢাকার পাশের একটি উপজেলার শিক্ষা অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল শনিবার এই প্রতিবেদককে জানান, বইয়ের চাহিদা স্কুল থেকে নিয়ে তারপরেই জেলাতে পাঠাতে হয়। অনেক সময় হাতে পর্যাপ্ত সময় না থাকার কারণে আগের বছরের চাহিদার আলোকেই প্রধান শিক্ষকগণ আনুমানিক একটি চাহিদাপত্র পাঠিয়ে দেন। এতে বইয়ের সংখ্যাগত বিভ্রাট হয়। আমরা মনে করি বইয়ের চাহিদা দেয়ার জন্য আগে ভাগেই নোটিশ দিতে পারলে ভালো হয়। আবার অনেক শিক্ষক তারা প্রযুক্তিগত দক্ষতা না থাকায় নিয়মিত মেইল চেক করতে পারেন না। ফলে জরুরি কোনো নোটিশ পাঠানো হলেও সময়মতো জবাবও পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগতভাবে এই কর্মকর্তা আরো মনে করেন শিক্ষা বোর্ড কিংবা বেনবেইজ থেকেও শিক্ষার্থীদের আপডেট তথ্য নিয়ে বইয়ের চাহিদা তৈরি করা যায়। সে ক্ষেত্রে শুধু বেসরকারি বা কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের সংখ্যা যোগ করলেই সব শিক্ষার্থীর একটি সঠিক পরিসংখ্যান সহজে পাওয়া যাবে।



