জাবি প্রতিনিধি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার পর অভিযুক্তের পরিচয় শনাক্তে সাংবাদিকদের কাছে এআই এনহ্যান্সড প্রযুক্তিতে উন্নত করা স্থিরচিত্র সরবরাহ করাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্তিতে ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১২ মে ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, ভুক্তভোগীসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রী সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযুক্তকে শনাক্ত করেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, সে সময় সাংবাদিকদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে দেয়া হয়নি এবং তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চরম অসহযোগিতা করা হয়েছে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গ্রুপে অভিযুক্তের এআই-জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যা বিভ্রান্তি আরো বাড়িয়ে দেয়। এমনকি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেও এই কৃত্রিম ছবিই সরবরাহ করা হয়। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই ভুল ছবি প্রকাশিত হওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের সংশোধনী বা ব্যাখ্যা না দিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেছে, যাকে প্রশাসনের চরম উদাসীনতা ও ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, লামিসার নেতৃত্বে কয়েকজন ছাত্রী সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে বাধা দেন। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং একজন সহকারী প্রক্টরে চাপ প্রয়োগ করে সাংবাদিকদের দূরে রাখেন। লামিসাকে একাধিকবার ছাত্র ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক ফাইজান আহমেদ অর্কসহ একাধিক নেতাকর্মীর সাথে ঘটনাস্থলে আলোচনা করতে দেখা যায়। এ দিকে শুক্রবার (১৫ মে) বিকেলে প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির পর সাংবাদিকদের কিছু মূল সিসিটিভি স্থিরচিত্র সরবরাহ করেন। তবে ওই ছবিগুলোর সাথে আগের দেয়া এআই এনহ্যান্সড ছবির তুলনা করলে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে বলে গণমাধ্যমকর্মীরা জানান।
এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মূল ছবি না দিয়ে এআই এনহ্যান্সড ছবি গণমাধ্যমে সরবরাহে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তিতে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকে অভিযোগ করছেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে এআই এনহ্যান্সড ছবি দেয়া হয়েছে। ফলে শুধু ক্যাম্পাসে না পুরো দেশজুড়ে অভিযুক্তের বিষয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এমনকি ঢাকা জেলা পুলিশ তাদের ফেসবুক পোস্টে এআই এনহ্যান্সড ছবি পোস্ট করে অভিযুক্তের ব্যাপারে তথ্য জানতে চেয়েছেন এবং পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।
এ বিষয়ে আজকের পত্রিকার জাবি প্রতিনিধি মুসফিক রেজওয়ান বলেন, ঘটনার পরবর্তী সময়ে প্রথম দিকে একদল নারী শিক্ষার্থী প্রশাসনের কাছে দাবি করে কেউ যাতে ভেতরে ঢুকতে না পারে। ফলে আমরা সাংবাদিকরা এবং জাকসুর প্রতিনিধিরা ভেতরে প্রবেশ করতে পারিনি। এরপর প্রায় ২-৩ ঘণ্টা পর আমাদের কেউ চাইলে একজন করে ভেতরে যেতে পারবে বলে জানানো হয়। কিন্তু এর মধ্যে অনেকে স্যোশাল মিডিয়ায় এআই জেনারেটেড ছবিটি প্রচার করলে সাংবাদিকরা সেই ছবি দিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এআই এনহ্যান্সড ছবিটি কাউকে দেই নাই। আমরা পুলিশ প্রশাসনকে মূল ফুটেজ দিয়েছি। তবে পাবলিকলি প্রকাশ করি নাই, আমাদের আরো আগেই ছবিটি পাবলিক করলে ভালো হতো।
প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ দাবি
এ দিকে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের দেয়া ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরসহ পুরো প্রক্টোরিয়াল বডির পদত্যাগ দাবিতে শুক্রবার ভিসির বাসভবনের সামনে রাতভর অবস্থান করেন শিক্ষার্থীরা।
শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান এলাকা থেকে মিছিল শুরু করেন কয়েকজন ছাত্রী। পরে তারা বিভিন্ন ছাত্রী হল প্রদক্ষিণ করে রাত ২টার দিকে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় প্রায় একশ শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরে রাত আড়াইটার দিকে ভিসি অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলতে আসেন এবং তাদের দাবি শোনেন।
এ সময় তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সেটি প্রক্টরিয়াল বডি দেখভাল করে। তবে বহিরাগত কেউ অপরাধ করলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় এবং সেটি মূলত পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত। তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করবে এবং তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় পুলিশকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে।
এরপর রাত ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা প্রক্টরসহ পুরো প্রক্টরিয়াল টিমের পদত্যাগের দাবিতে আরো জোরালো অবস্থান নেন। তাদের দাবি, পুলিশের দায়িত্ব পুলিশ পালন করবে, কিন্তু প্রশাসনের অবহেলার দায় প্রক্টোরিয়াল বডিকে নিতে হবে। ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ হওয়ায় তারা প্রক্টরিয়াল টিমকে ভিসির বাসভবনের সামনে এসে পদত্যাগের ঘোষণা দেয়ার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাত সোয়া ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বুধবার রাতে শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেয়। সেখানে বলা হয় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে প্রক্টরিয়াল বডিকে পদত্যাগ করতে হবে। দাবি দেয়ার ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার পরে ফের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের ডাক দেন।



