বল্লামুখা বাঁধ মেরামতে বিএসএফের বাধায় সীমান্তে উত্তেজনা

ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কায় কয়েক লাখ বাংলাদেশী

Printed Edition

আবুল হাসান ছাগলনাইয়া-পরশুরাম (ফেনী)

ফেনীর পরশুরাম সীমান্তে ৪০ বছর আগে নির্মিত বল্লামুখা বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজে ফের বাধা দিয়েছে ভারতীয় বিএসএফ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরশুরাম সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এ দিকে গতকাল রাত থেকে বিএসএফ সীমান্তে লাগানো লাইট বন্ধ করে কয়েকটি বাঙ্কার খনন করেছে বলে স্থানীয় জানিয়েছেন। অপর দিকে, বাঁধের মেরামতের ব্যাপারে দু’দেশের যৌথ নদী কমিশনের নির্দেশনা পাওয়ার আগে বাঁধের বিরোধীয় জায়গায় মেরামতের কাজ বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে বিএসএফ। এ নিয়ে বিজিবি চার ফেনীর কমান্ডিং অফিসার ও ৪৩ বিএসএফের অধিনায়কের সাথে কথা বললেও বিএসএফ তাদের অবস্থান বদলায়নি বলে জানা গেছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ঘটনাস্থলে এসে বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ বিজিবিকে ফেনী রক্ষা বেড়িবাঁধ মেরামতে মাটি ফেলতে বাধা প্রদান করে বলে বিজিবি সূত্রে নিশ্চিত করেছে ।

১৯৮৩ সালে নির্মিত ভারতের উজানের পানি থেকে ফেনী জেলার কয়েক লাখ মানুষের জান-মাল রক্ষার বাঁধ হিসেবে পরিচিত বল্লামুখা বাঁধের মেরামত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে ফেনীর সীমান্তবর্তী কয়েক লাখ মানুষের দিন কাটছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। ভারত-বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি আগে ফেনীর পরশুরামে বাংলাদেশের নিজকালিকাপুর বল্লামুখা বেড়িবাঁধ ৩০ মিটার জায়গায় মেরামতের কাজ বন্ধ বলে বিজিবি থেকে আভাস পাওয়া গেছে। এ দিকে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বল্লামুখা বাঁধ শুষ্ক মৌসুমে মেরামত করা না গেছে ২০২৪ সালের বন্যা থেকেও ফেনীর জীবনে আরো ভয়াবহ মানবসৃষ্ট দুর্যোগ নিয়ে আসতে পারে বলে নিজেদের আশঙ্কার কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন বাংলাদেশীরা। এদিকে, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ তারিখে ফেনীর পরশুরামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বল্লামুখা বাঁধ ও মুহুরীনদীর তীর পরিদর্শন করে বল্লামুখা বাঁধ দ্রুত সময়ের মধ্যে টেকসই মেরামত করে ফেনী সীমান্তে বিরোধপূর্ণ সমস্যাগুলো দু’দেশের নাগরিকদের স্বার্থে শান্তিপূর্ণভাবে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান ।

জানা গেছে, ভারতের উজানের পাহাড়ি থেকে বাংলাদেশের ফেনীর পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, ফুলগাজীসহ ফেনী জেলার মানুষের ঘর-বাড়ি, ফসলসহ সহায় সম্বল বাঁচাতে ৪০ বছর আগে ১৯৮৩ সালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিলোনিয়ার বল্লামুখা-বাংলাদেশের নিজকালিকাপুর এলাকায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ ও দেড় শ ফুট প্রস্ত এবং প্রায় ৩৫ ফুট উচ্চতার বল্লামুখ বেড়িবাঁধ তৈরি করে বাংলাদেশ। বল্লামুখ বাঁধটি বল্লামুখা খাল ও মুহুরী নদীর সংযোগ (জিরোপয়েন্ট) এলাকা থেকে শুরু হয়ে বাংলাদেশের নিজকালিকাপুর গ্রামের ওপর দিয়ে পশ্চিম দিকে রাঙামাটিয়া পাহাড়ে গিয়ে শেষ হয়। বিগত বছরগুলোতে ভারতের উজানের পাহাড়ি ঢলের পানির তোড়ে মুহুরী ও কহুয়া নদীর বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধের ভাঙনের কারণে নদীর তীরবর্তী ফেনীর সীমান্তবর্তী ছাগলনাইয়া,পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতো। ২০২৪ সালের বন্যায় ভারত সীমান্তবর্তী মুহুরীকহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর ১০২টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। যার মধ্যে মেরামত কাজ সম্পন্ন হয় ৯৬টি ভাঙা অংশের। এতে ব্যয় হয় ৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ভারতের উজানের পানির তোড়ে মুহুরী নদীর তীরবর্তী পরশুরামের নিজ কালিকাপুর সীমান্তের বল্লারমুখা বেড়িবাঁধের তিনটি স্থানে প্রায় ৫০০ মিটার বেড়িবাঁধে ভ

সরেজমিন ভাঙন এলাকায় ফেনীর সাংবাদিকরা ঘটনাস্থল গেলে স্থানীয় নিজকালিকাপুর গ্রামের বাসিন্দা সাহাব উদ্দিন, মাস্টার মামুন, নোমান মজুমদারসহ এলাকাবাসী জানান, ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট রাতে ভারতের বিলোনিয়া শহরকে বন্যা থেকে বাঁচাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিকরা বল্লামুখা বাঁধের মুহুরী নদীর সংযোগস্থলে বাঁধ কেটে দেয় । এতে বল্লারমুখা বেড়িবাঁধে দুই স্থানে ২৬০ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এর মধ্যে ১৯০ মিটারের কাজে বিএসএফ বাধা প্রদান না করলেও অন্যটি ৭০ মিটার দীর্ঘ বাঁধ পুনর্নির্মাণে বাধা প্রদান করে। ৭০ মিটার বাঁধের অংশে ৩০ মিটার দু-দেশের সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বলে ভারতীয় বিএসএফ এমন অভিযোগ করে দফায় দফায় বেড়িবাঁধ মেরামতে বাধা প্রদান করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ সীমান্তবাসীর।

ভারতের পাহাড়ি ঢলের পানিতে বিগত বন্যায় ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, ফেনী সদর ও ফুলগাজী উপজেলাসহ জেলার বেশির ভাগ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। স্মরণকালের ওই বন্যায় জেলার কয়েক লাখ মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল ও সম্পদ হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়। বন্যার পানি চলে যাওয়ার পর থেকে বর্তমান শুষ্ক মওসুমে বাঁধ পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিল এলাকাবাসী। ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ড বল্লামুখা বাঁধ প্রায় ৭ কোটি ২২ লাখ ব্যয়ে ভাঙনা স্থানে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাঁধের মেরামতের কাজ করলেও এ নিয়ে দু’দফায় ভারতীয় বিএসএফ বাধা প্রদান করে। স্থানীয় বাংলাদেশীদের অভিযোগ ৪০ বছর আগের পুরনো মাটির বেড়িবাঁধ মেরামতে বাংলাদেশকে বাধা দিয়ে ভারতীয় বিএসএফ মানবতাবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়েছে। আগামী বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ফেনীবাসীর জান-মাল রক্ষায় বল্লামুখা বাঁধের মেরামতের কাজ সমাপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন সীমান্তবর্তী বাংলাদেশীরা।

এ ব্যাপারে বিজিবি চার ফেনীর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন জানিয়েছেন, ভারতীয় বিএসএফের পক্ষ থেকে দু’দেশের নদী কমিশনের নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত বাঁধের কাজ বন্ধ রাখতে জানিয়েছে।