বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম
ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় সংঘবদ্ধ ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) সিন্ডিকেটের দ্বারা এমন অভিযোগ দীর্ঘ বছরের। সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু তাদের কিছুই হয় না। এমনিতেই রোজার আগে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ায় সংঘবদ্ধ চক্রটি। কোরবানী সামনে রেখেও এই চক্রের অপতৎপরতায় বাজারে ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকার লিটার প্রতি ৪ টাকা বাড়ানোর সাথে সাথেই বাজারে ভোজ্য তেলের সরবরাহ সঙ্কটও কেটে গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে সরকার কি ডিও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়?
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যাংক লোন পেতে যা গলদঘর্ম অবস্থা হয়, সে তুলনায় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই ব্যাংক লোন পেয়ে যান। আর ব্যাংকের উচ্চ সুদের কারণে কোম্পানিগুলো দ্রুত পণ্য বিক্রি করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে পণ্য উৎপাদন শুরুর আগেই কোম্পানিগুলো ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) বিক্রি করে দেয়। আর সেটারই সুযোগ নেয় ডিও ব্যবসায়ীরা।
সূত্র জানায়, গেল মার্চের শেষ দিক থেকে সংঘবদ্ধ চক্রটি বাজারে ভোজ্য তেলের সরবরাহ আস্তে আস্তে কমিয়ে দেয়। এক পর্যায়ে বেশির ভাগ দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের অস্থিত্বই ছিল না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতদিন সঙ্কট দেখালেও সরকার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানানোর পর সঙ্কট নাই হয়ে গেছে।
ডিও সিন্ডিকেট কিভাবে কাজ করে
ব্যবসায়ী দিদারুল আলম জানান, খাতুনগঞ্জের বাজারে পণ্য বেচাকেনা ও লেনদেনে পুরনো কিছু প্রথা চালু আছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) প্রথা। দেখা যায়, পণ্য হাতে না পেলেও ওই স্লিপটি বেচাকেনা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন- ধরেন এক বড় ডিও ব্যবসায়ী নামি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০ ড্রাম পণ্যের ডিও কিনেছেন। তার কাছ থেকে ৪/৫ ড্রাম করে অনেকেই ডিও কেনেন। সেখানে এক দফা দাম বাড়ে। ৪/৫ ড্রামের ডিও যারা কিনেন তারা আবার অন্যের কাছে সেই ডিও বিক্রি করেন। এভাবে ডিওর হাত বদলেই বাড়তে থাকে পণ্যমূল্য।
আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোম্পানিগুলো থেকে বৃহৎ ডিও ব্যবসায়ীরা ডিও ক্রয় করলেও কোম্পানি থেকে সরবরাহ না নিয়ে কয়েক দিন চুপ করে বসে থাকেন। এই ফাঁকে বাজারে সরবরাহ সঙ্কটের অজুহাতে বাজার উর্ধ্বমুখী হলে বাড়তি দামে সেই ডিও বিক্রি করেন। ফলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ডিও ব্যবসায়ীদের হাতেই থেকে যাচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানির পণ্যের উৎপাদন হওয়ার আগেই ডিও’র হাত বদলে পণ্যমূল্য বাড়তে থাকে বলেও সূত্র জানায়।
খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, আমদানিকারকরা ভোজ্যতেল ও চিনিসহ নানা পণ্য আমদানি বা উৎপাদনের কয়েক মাস আগেই বাজার থেকে শত শত কোটি টাকা সংগ্রহ করে। আর বাজারে পণ্য আসার আগেই হাত বদল হয়ে ডিও’র দাম বাড়তে থাকে। আর ডিও’র দাম বাড়া মানেই পণ্যের মূল্য বাড়া, যা ভোক্তাদের ঘাড়েই বর্তায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাতুনগঞ্জের বাদশা মিয়া মার্কেট, সোনামিয়া মার্কেটসহ বেশ ক’টি মার্কেট কেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ডিও ব্যবসার সাথে জড়িত। কোম্পানিগুলো ১০০ থেকে ২০০ গাড়ি পণ্য একসাথে বিক্রি করে। ফলে বড় পার্টি ছাড়া সেগুলো নিতে পারে না। মূলত উৎপাদকদের থেকে পণ্যের ডিও কিনে নিয়ে ডিও ব্যবসায়ীরাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। বাজারের পুরো নিয়ন্ত্রণই তাদের হাতে বলছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের মতে বড় পার্টি আছে ২০ জন। এর বাইরে আছে প্রায় দুই শতাধিক ডিও ব্যবসায়ী। ঠিকমতো আমদানি হলেও সরকার কর্তৃক ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা না আসা পর্যন্ত ডলার সঙ্কটে এলসি খোলা যাচ্ছে না এমন অজুহাতে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে রেখেছিল এই সিন্ডিকেট।
ভোজ্য তেলের গতকালের বাজার দর
এ দিকে গতকাল রোববার খুচরা বাজারে সুপার পাম তেল প্রতি লিটার ১৭৪ টাকা, পাম তেল ১৭০ টাকা, বোতলজাত সয়াবিন ১ লিটার ২০০ টাকা, ২ লিটার ৪শ’ টাকা এবং ৫ লিটার বোতল ৯৭৫ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। বড় দোকানগুলোতে খুচরায় খোলা সয়াবিন প্রতি কেজি ২০২ (লিটার ১৮২) টাকা, পাম তেল প্রতি কেজি ১৮০ (লিটার ১৬০) টাকা, সুপার পাম প্রতি কেজি ১৮৬ (লিটার ১৬৬) টাকা বিক্রি হচ্ছে।
আর খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে প্রতিমণ পাম তেল ছয় হাজার ৪৫০ টাকা, সুপার পাম প্রতিমণ ছয় হাজার ৭০০ টাকা এবং সয়াবিন প্রতিমণ সাত হাজার ২৭০ টাকা।
বাজার সিন্ডিকেটের বিকল্প
বাজার সিন্ডিকেটের বিকল্প হিসেবে প্রান্তিক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির ব্যাপ্তি বাড়ানোর পরামর্শ বাজার বিশ্লেষকদের।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারিভাবে এলাকাভিত্তিক টিসিবির কার্ড দিয়ে নির্দিষ্টসংখ্যক স্বল্প আয়ের মানুষদের কম মূল্যে নিত্যপণ্যের জোগান দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় টিসিবির কার্ড বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। শাসক দলের লোকজন এসব কার্ড নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সেক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের গুরুতর অভিযোগ প্রায় সর্বত্র।
ব্যবসায়ী এস এম আবু তৈয়বের মতে- শুল্কায়ন পর্যায়ে ঘুষ, পরিবহন ব্যয় এবং পথে পথে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পণ্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।



