মাওলানা এম এ হালিম গজনবী এফসিএ
কুরআনের শুরুর কয়েকটি আয়াতেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে, কুরআন অলৌকিক ও অতুলনীয় অত্যাশ্চর্য। কারণ এ আয়াত কয়টির মধ্যেই জান্নাত ও জাহান্নামবাসীর ঘোষণা সীমাহীন শক্তিধর আল্লাহ বিশ্ববাসীকে জ্ঞাত করলেন যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে কুরআন অলৌকিকত্ব ও অসীম শক্তিধরের বাণী। সূচনাতেই দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা ‘এ কিতাবে (কুরআনে) কোনো সন্দেহ নেই, ত্রুটি নেই, শতভাগ সত্য ও ত্রুটিমুক্ত। তারপর রাহমান রাহিম আল্লাহ তায়ালা সর্বোচ্চ সুসংবাদ দিলেন ‘কারা’ জান্নাতবাসী। ঠিক পরবর্তী পর্যায়ে পাশাপাশি জ্ঞাত করলেন চরম-পরম দুঃসংবাদ হিসেবে ‘কারা’ জাহান্নামবাসী। কুরআনের শুরুতেই সর্বোচ্চ সুসংবাদ ও সর্বোচ্চ দুঃসংবাদ প্রদান কুরআনের অতুলনীয় সর্বশ্রেষ্ঠত্ব সন্দেহাতীতভাবে কি প্রমাণ করে না? উত্তর হবে, নিঃসন্দেহে বা নিশ্চিতভাবে তা প্রমাণ করে। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে চিন্তার উপকরণ, আল্লাহকে চেনার বিশাল মাধ্যম, যারপর নেই সচেতন হওয়ার বিষয়ও বটে। কুরআন সত্যিই সর্বোচ্চ অত্যাশ্চর্য কিতাব। আমেরিকার মিশিগান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মাইকেল এইচ হার্ট উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী দ্বারা দীর্ঘ সময় ধরে সাধনার ফসল হিসেবে বিশ্বের শতজন শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী নির্বাচন করেন। কুরআনপ্রাপ্ত মুহম্মাদ সা:-কে এক নম্বর স্থান না দিয়ে পারেননি। সেখানে তাদের রাসূল ঈসা আ:-কে স্থান দিয়েছেন ৩ নম্বরে। যার ওপর আল্লাহ অবতীর্ণ করেছিলেন ‘ইঞ্জিল’ বা ‘বাইবেল’। মুসা আ:-কে যিনি ইহুদিদের রাসূল, যার ওপর আল্লাহ অবতীর্ণ করেছিলেন ‘তাওরাত’, তিনি স্থান পেয়েছিলেন ১৫ নম্বরে।
রাসূল সা: নবী-রাসূলদের নেতা ও ইমাম। তাঁর ওপর আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন ‘কুরআন’ যা হতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ আল্লাহ প্রদত্ত উল্লেখযোগ্য চারখানা ধর্মীয় গ্রন্থের মধ্যে। কুরআনে হাফেজের সংখ্যা অগণিত। তাওরাতে হাফেজ ছিলেন মাত্র একজন যার নাম ওজায়ের আ:। যে কারণে ইহুদিরা আশ্চার্যান্বিত হয়ে তাকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করেছিল। নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক।
যাই হোক, মূল আলোচনায় আসি। কুরআনের শুরুতেই যে কয়টি আয়াতের মাধ্যমে জান্নাত ও জাহান্নামবাসীর সিদ্ধান্ত আল্লাহ আমাদেরকে জ্ঞাত করলেন, সে আয়াতগুলো নি¤েœ আলোচনা করা হলো যার সংখ্যা মাত্র সাতটি। (সূরা আল বাকারা : ১-৭) অর্থ : আলিফ লাম মিম (যার অর্থ আল্লাহই ভালো জানেন)। অর্থ : এটি ওই (মহান) কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য পথ নির্দেশক বা প্রদর্শক (মুত্তাকি হলেন সর্বোচ্চ গুণে গুণান্বিত) কুরআন হলো তার প্রদর্শক যা কুরআনের তাৎপর্য ও গুরুত্বের সাক্ষ্য বহন করে।
“যারা (মুত্তাকিগণ) গায়বের (আল্লাহ, পরকাল, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, তাকদির ইত্যাদির) প্রতি ঈমান আনে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি যে জীবনোপকরণ (ধন-সম্পদ) তাদের দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। আর তোমার (রাসূল সা:-এর) প্রতি যা নাজিল হয়েছে (কুরআন) ও তোমার (রাসূল সা:-এর) আগে যা নাজিল হয়েছে (তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিল ইত্যাদি) তাতে তারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং পরকালের প্রতিও তারা নিশ্চিত বিশ্বাসী। তারাই (উপরোক্ত গুণাবলিসম্পন্ন ব্যক্তি) তাদের প্রতিপালকের হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত আছে, আর তারাই (উপরোক্ত গুণাবলিসম্পন্ন ব্যক্তি অর্থাৎ মুত্তাকিগণ, মুমিনগণ ও মুসলিমগণ) সফলকাম বা জান্নাতবাসী।”
‘নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে তাদেরকে তুমি (রাসূল সা:-এর) ভয় দেখাও আর না দেখাও উভয়টাই তাদের জন্য সমান, তারা ঈমান আনবে না (মুত্তাকি, মুমিন ও মুসলিম হবে না)।’
“আল্লাহ তাদের অন্তর ও কানের ওপর মোহর মেরে দিয়েছেন (ফলে তারা সত্যকে বোধগম্য করতে বা শুনতেও পারবে না), আর তাদের চোখে আছে আবরণ (ফলে তারা সত্য দেখতে পারবে না) আর তাদের জন্য আছে মহাশাস্তি” অর্থাৎ জাহান্নামবাস উপরোক্ত অসৎগুণাবলি ধারণ ও মুমিন না হওয়ার কারণে।
সম্মানিত মুমিন ভাই ও বোন! দয়া করে কুরআনের প্রতি আকৃষ্ট হোন, কুরআনকে যথাসাধ্য ধারণ ও বাস্তবায়ন করুন, জীবনকে আলোকিত করুন, উদ্দেশ্য থাকবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
প্রাক্তন সচিব, বাংলাদেশ সরকার, জনাব আসাফুদ্দৌলা ৩০ পারা কুরআনের প্রশংসনীয় বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন। ১৯৪০-এর দিকে নারায়াণগঞ্জ এলাকা নিবাসী গীরিশ চন্দ্র রায় একজন হিন্দু জ্ঞানী লোক পুরো কুরআন আদ্যোপান্ত বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন যা আমার হস্তগত হয়েছিল বাল্যকালে। কুরআনের প্রভাব অকল্পনীয়। হজরত ওমর রা: রাসূল সা:-কে হত্যা করতে রওনা হলেন। নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক। প্রথিমধ্যে সৌভাগ্যবশত নব্যমুসলিম ভগ্নি ও ভগ্নিপতির সাহচর্যে এসে কুরআনের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে গন্তব্যে পৌঁছে রাসূল সা:-এর পায়ে পড়ে গেলেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন হত্যা করার পরিবর্তে। কুরআনের প্রভাব কতটা অভাবনীয় উঁচুস্তরের, ফ্রান্সের মরিস বুকাইলি কুরআনের ভুল বের করতে গিয়ে কুরআনের প্রভাবে নিজের ভুলই ধরা পড়ে গেল এবং গ্রহণ করলেন ইসলাম ধর্ম। অনেক অমুসলিম মুসলিম হচ্ছেন আজকালও। উদাহরণস্বরূপ আমার জানা মতে, ডা: জাকের নায়েক, মরহুম মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী, নিউজিল্যান্ডবাসী কম্পিউটার ইঞ্জিনীয়ার জনাব আতাউর রহমান প্রমুখ যাদের মাধ্যমে অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
হে দয়ালু আল্লাহ! দয়া করে আপনার গোলামগণকে তাওফিক দিন কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত পরিপূর্ণ মুত্তাকি, পরিপূর্ণ মুমিন ও পরিপূর্ণ মুসলিম হয়ে মৃত্যুবরণ করতে, যাতে করে পালন করা হবে আপনার সে মহামূল্যবান বাণীটি- “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আলে ইমরান-১০২)
লেখক : সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ



