টিকে থাকার লড়াইয়ে শীতল পাটির গ্রাম

Printed Edition

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ

একসময় ময়মনসিংহের গফরগাঁও ও গাজীপুরের শ্রীপুর সীমান্তবর্তী কুরচাই ও চাকুয়া গ্রামের পরিচয় ছিল ‘শীতল পাটির গ্রাম’ হিসেবে। বানার নদীর তীরঘেঁষা এই জনপদজুড়ে শত শত পরিবারের জীবিকা ও সংস্কৃতির অংশ ছিল শীতল পাটি বুনন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, বাজার সঙ্কট এবং প্লাস্টিকজাত পণ্যের আগ্রাসনে শতবর্ষী এই কুটিরশিল্প এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে। বর্তমানে মাত্র ৭০ থেকে ৮০টি পরিবার ঐতিহ্যটিকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

গ্রামের বাড়ির বারান্দায় এখনো দেখা যায় নারীদের ব্যস্ত হাত। সূক্ষ্ম নকশা ও কারুকাজে তারা তৈরি করেন শীতল পাটি, আর পুরুষেরা মুর্তা গাছ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করার কাজে যুক্ত থাকেন। একটি পাটি তৈরির প্রতিটি ধাপেই পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ যেন এই শিল্পকে পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিণত করেছে।

৭০ বছর বয়সী কারিগর গোপাল চন্দ্র দে জানান, মুর্তা সংগ্রহের পর তা শুকিয়ে তিন ফালি করা হয়। এর প্রথম অংশ ‘নাল’ দিয়ে তৈরি হয় উন্নতমানের পাটি। একসময় প্রতিদিন একটি করে পাটি তৈরি হলেও এখন চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদনের গতি অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়েছে।

এই অঞ্চলে বেতের পাটি, বোকা পাটি, নামাজের পাটি ও বিছানার পাটিসহ নানা ধরনের পণ্য তৈরি হয়। মান ও আকারভেদে প্রতিটির দাম এক হাজার ২০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে বাজার সঙ্কোচন এবং ক্রেতার অভাবে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শিল্পটির মূল চালিকাশক্তি নারীরা। বুলবুলি রানী সরকার বলেন, শীতল পাটি বিক্রির আয় দিয়েই পরিবারের খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনা চালাতে হয়। কিন্তু বিক্রি কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান স্বরস্বতী সূত্রধরও। সংসারের কাজের পাশাপাশি পাটি বুনে তিনি পরিবারে অর্থনৈতিক সহায়তা দিলেও এখন পেশাটি ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

কারিগরদের মতে, প্লাস্টিকের সস্তা ও সহজলভ্য পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না শীতল পাটি। যমুনা রানী দে বলেন, তাদের পণ্যের গুণগত মান ভালো হলেও ন্যায্য মূল্য ও পর্যাপ্ত বাজার না থাকায় নতুন প্রজন্ম এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে।

শীতল পাটি বুনন শিল্পী সমিতির সভাপতি উজ্জ্বল চন্দ্র দে মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা গেলে শিল্পটি আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

উপজেলা প্রশাসনও শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই কুটিরশিল্প একসময় হারিয়ে যেতে পারে। বানার নদীর তীরের প্রতিটি শীতল পাটির ভাঁজে জড়িয়ে আছে একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প। সেই গল্প বাঁচিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা।