বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করে ২০২১ সাল থেকেই। কিন্তু তখনকার সরকার বিষয়টি আমলে নেয়নি বলে বর্তমানে হাম রোগটি বাংলাদেশে প্রায় মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। জানা গেছে, বিষয়টি তখনকার সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কিংবা ইউনিসেফ অবগত ছিল। কিন্তু সরকার ব্যবস্থা না নেয়ায় তারাও এ বিষয়ে সরব হয়নি। এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গতকাল ৯ মে পর্যন্ত সাড়ে তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম অথবা হাম সন্দেহে। এত শিশুর মৃত্যু হলেও স্বাস্থ্য অধিদফতর গতকাল পর্যন্ত ৬১ শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে যে এরা হামের সংক্রমণেই মারা গেছে। ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৬ হাজার ৯৭৯ শিশু এবং হাম সন্দেহে আক্রান্ত হয়েছে ৪৭ হাজার ৬৫৬ শিশু। দেশে প্রতিদিনই হামে অথবা হাম সন্দেহে এক থেকে দেড় হাজার শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, হামের টিকার মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় এতগুলো শিশু ঝরে গেছে এবং এ মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে। বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সারা দেশে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়স পর্যন্ত এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেয়ার টার্গেট নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যেই এক কোটি ৭৬ লাখ শিশুকে টিকা দেয়া হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও ওই বয়সী শিশুদের মধ্যে শহরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু বাদ পড়ে গেছে এবং গ্রামে ১৫ শতাংশ বাদ পড়েছে। সবার মধ্যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা (হার্ড ইমিউনিটি) অর্জন করতে হলে ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। ইতোমধ্যে ৯ মাস বয়সী শিশুদের ৯১ শতাংশ এবং গ্রামে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের ৮১ শতাংশকে টিকা দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো: কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন যে, হামের টিকা সঠিক সময়ে কেন সংগ্রহ করা গেল না এ বিষয়ে একটি তদন্ত চলমান আছে। শেষ হলে সবাইকে জানানো হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের কাছে হামের পর্যাপ্ত টিকা আছে। এখন থেকে হামের টিকা দেয়া চলমান থাকবে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, হাম হলে শিশুরা নিউমোনিয়ায় ভোগে। নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় গাইডলাইন আছে। সেই গাইডলাইনে কখন কী ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে এবং শিশুকে রেফার করতে হবে তা উল্লেখ আছে। টিকার ব্যাপারে বিশিষ্ট টিকা বিজ্ঞানী ড. ফিরদৌসী কাদরির নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করছে, তারা পরামর্শ দিচ্ছেন।
বাংলাদেশের শিশুরা কেন সঠিক সময়ে হামের টিকা পেল না ?
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ই হামের টিকার একটি চালান আসে এবং সর্বশেষ হামের চালান আসে চলতি বছরের গত ১৩ মার্চ। কিন্তু সেই টিকা মাঠে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ তখন অপারেশন প্ল্যান ছিল না। টিকা মাঠে পৌঁছে দেয়ার জন্য গাড়ির তেল খরচ ছিল না। অন্য দিকে মাঠ পর্যায়ে টিকাদানকারীরা ধর্মঘটে ছিলেন কারণ তাদের চাকরি থাকলেও বেতন ছিল না। ফলে তারা কাজ করেননি। এ ছাড়া এর আগে বাংলাদেশ সরকার হামের টিকা সংগ্রহ করত ইউনিসেফের মাধ্যমে কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে এই পদ্ধতি বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র (ওটিএম) চালু করে। এই পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘসূত্রতা, জটিলতা ও অবশেষে সঠিক সময়ে টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারীর বক্তব্য
এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ইপিআইয়ের নিয়মিত কর্মসূচিতে হামের টিকাসহ ৪টি টিকা সম্পূর্ণ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে কেনা হয়। অন্য টিকাগুলোর ক্ষেত্রে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) পাশাপাশি সরকার আংশিক মূল্য পরিশোধ করে থাকে। গ্যাভি শুধু নতুন টিকা শুরু করা এবং ক্যাম্পেইনের টিকার সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বিধি অনুযায়ী সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে কেনার ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৬ অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা আছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ইপিআইর জন্য টিকা কেনার অনুমতির অনুরোধ উপস্থাপনের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি সরকারি সংগ্রহ আইনের ৬৮(১) উল্লেখ করে রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন বা জনস্বার্থে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সরাসরি সংগ্রহের পদ্ধতিতে (ডিপিএম) টিকা কেনার অনুমোদন দেয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় টিকা ক্রয়ে পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠে সরকারের নিজস্ব সামর্থ্য অর্জন করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। নভেম্বর মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রায় ৪১৯ কোটি টাকার টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে ডিপিএম পদ্ধতিতে সংগ্রহের জন্য অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির কাছে পাঠায় এবং অনুমোদিত হয়। ভবিষ্যতে ইপিআইর টিকা কেনার ক্ষেত্রে উপযুক্ত আইন ও স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত বিধায় সেই বিষয়ে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একটা আদেশ জারি করা হয় কিন্তু তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রয়োগ করা হয়নি।



