নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- গাজায় ত্রাণ সঙ্কট তীব্র
- গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ২৬৩
- গাজা যুদ্ধে ইসরাইলের অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি
- পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা : ঘরবাড়ি ও যানবাহনে আগুন
গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধের প্রভাব এবারের ঈদুল ফিতরের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ঈদের ধর্মীয় আচার ও সামাজিক রীতি বজায় থাকলেও আনন্দের জায়গা দখল করেছে শোক ও বেদনা। নামাজ, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যাওয়া, শিশুদের উপহার দেয়া- সব কিছুই হয়েছে, কিন্তু উৎসবের স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস ছিল না। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
বাসিন্দারা দ্য গার্ডিয়ানকে জানান, আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে তারা দেখেছেন প্রায় প্রতিটি পরিবারই যুদ্ধের কারণে প্রিয়জন হারিয়েছে। কোথাও সন্তান, কোথাও স্বামী বা স্ত্রী, আবার কোথাও পুরো পরিবার হারানোর ঘটনা ঘটেছে। অনেক পরিবার এখন ভাড়া বাড়ি বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছে। এ অবস্থায় ঈদের সাক্ষাৎগুলো আনন্দের চেয়ে শোক ভাগাভাগির অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মানুষ একে অপরের কাছে যাচ্ছে শুধু শুভেচ্ছা জানাতে নয়, বরং হারানো স্বজনদের স্মরণ করতে এবং শোকাহতদের পাশে দাঁড়াতে। স্থানীয়দের ভাষায়, এবারের ঈদ আনন্দের নয়, বরং ক্ষতি, বেদনা ও টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
গাজায় ত্রাণ সঙ্কট তীব্র : এ দিকে গাজা উপত্যকায় ত্রাণ প্রবেশের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করছে যে, গাজার হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। গত অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো অমান্য করে গত কয়েক দিনে ইসরাইলি বিমান ও ড্রোন হামলায় গাজা সিটি এবং খান ইউনুসে শিশু ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ বহু ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও এখনো সেখানে নিয়মিত কামানের গোলা ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বি’সেলেম-এর তথ্যমতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ২৬৩
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ২৬৩ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া হামলায় আহত হয়েছেন প্রায় এক লাখ ৭১ হাজার ৯৪৪ জন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুদ্ধবিরতির পর থেকে শত শত মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে বহু লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, এখনও হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গাজা যুদ্ধে ইসরাইলের অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি
গাজায় দীর্ঘ দুই বছরের যুদ্ধে ইসরাইলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের মোট উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ। যুদ্ধের ব্যয়, বাণিজ্য হ্রাস এবং আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের প্রভাব এতে ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে
গাজার মধ্যাঞ্চলে এক বছরের একটি শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র জানায়, শিশুটির বাবার কাছ থেকে তথ্য আদায়ের জন্য তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেনারা শিশুটির শরীরে সিগারেটের আগুন দিয়ে পোড়ায় এবং ধারালো বস্তু দিয়ে আঘাত করে। পরে আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে শিশুটিকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হলেও তার বাবা এখনও আটক রয়েছেন। চিকিৎসা প্রতিবেদনে শিশুটির শরীরে পোড়া ও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
রাফাহ সীমান্তে ফেরার পথে ফিলিস্তিনি আটক
মিসরের সাথে সংযোগকারী রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজায় ফেরার সময় এক ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরাইলি বাহিনী। এটি সীমান্ত পুনরায় খোলার পর প্রথম এমন ঘটনা। খবর আনাদোলু এজেন্সির। স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর অনেক যাত্রীকে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হলেও কেউ কেউ আটকের মুখে পড়ছেন। এতে চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে চাওয়া অসংখ্য রোগী ও আহত মানুষের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা : ঘরবাড়ি ও যানবাহনে আগুন
অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রামে উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ঘরবাড়ি, যানবাহন ও কৃষি জমিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। গত শনিবার ১৮ বছর বয়সী এক বসতি স্থাপনকারী যুবক ইয়েহুদা শারম্যানের মৃত্যুর পর এই সহিংসতা শুরু হয়। তিনি কোয়াড বাইকে থাকা অবস্থায় একটি গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন বলে জানা গেছে, এবং গাড়িটি এক ফিলিস্তিনি চালাচ্ছিল। ইসরাইলি পুলিশ বলেছে, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে ‘প্রতিশোধ অভিযান’-এর ডাক দেয়া হয়। ইসরাইলি সংবাদ মাধ্যমের বরাতে একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাতারাতি ২০টিরও বেশি বসতি স্থাপনকারী হামলার খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার পর থেকেই বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানায়, শনিবার রাতে বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও বিশৃঙ্খলার খবর পেয়ে তাদের সেনা ও সীমান্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। জালুদ, কারিউত, আল-ফান্দুকুমিয়া এবং সিলাত আদ-ধাহ গ্রামগুলো হামলার শিকার হয়। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা গেছে, কালো পোশাক পরা ৯০ জনেরও বেশি ব্যক্তি (যাদের অনেকে মুখোশধারী) জালুদ গ্রামে দৌড়ে ঢুকছে। আরও কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, একাধিক গাড়িতে আগুন জ্বলছে, ভবনের জানালা ভাঙা এবং অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজছে। একটি ছবিতে একটি ভবনের দেয়ালে ¯েপ্র-পেইন্ট দিয়ে লেখা ছিল ‘ইয়েহুদার প্রতিশোধ নাও’।
ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, জালুদে হামলাকারীদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে অন্তত তিন ফিলিস্তিনি মাথায় আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ইসরাইলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, বসতি স্থাপনকারীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লেখা হয়েছিল, ‘ইহুদি রক্ত ঝরলে আমরা চুপ থাকব না।’ আরেকটি বার্তায় বলা হয়, ‘আমরা প্রতিশোধ এবং শত্রুর বহিষ্কার চাই।’
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এতে ‘বাড়িঘর ও সম্পত্তি পুড়িয়ে দেয়া, বেসামরিক নাগরিকদের আতঙ্কিত ও হত্যা করা এবং ঈদুল ফিতরের সময় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে হামলা চালানো হয়েছে।’
রোববার ইসরাইলি পুলিশ জানায়, দেইর আল-হাতাব গ্রামের কাছে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। একই সাথে তারা জানায়, ইতামার বসতির কাছে কিছু ইসরাইলি নাগরিক নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালালে এক কর্মকর্তা আহত হন। পুলিশ বলেছে, তারা ‘উগ্র সহিংস ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করছে।
ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা ‘ইয়েশ দিন’ এই হামলাকে ‘পোগ্রম বা হত্যাযজ্ঞের রাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটি রোববার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে জানায়, ‘হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনী যথাযথ প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই হত্যাযজ্ঞ রুখতে কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’
রোববার ইয়েহুদা শারম্যানের জানাজায় ৫০০ জনের বেশি মানুষ অংশ নেয় বলে ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে। এতে দেশটির কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচও উপস্থিত ছিলেন, যিনি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেয়ার অভিযোগে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছেন। রোববার সন্ধ্যায় পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। কিছু সূত্রে জানা গেছে, কিছু বসতি স্থাপনকারী আবারও বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রামের বাইরে জড়ো হচ্ছিল। স্থানীয় বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, তারা নাবলুসের উত্তর-পশ্চিমে একটি কার ওয়াশ সেন্টারে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এর আগে চলতি মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য ইসরাইলকে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায়, যা ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেড়ে গেছে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের হাতে সাতজন ফিলিস্তিনি এবং ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ১৮ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর। এ ছাড়াও অধিকৃত পশ্চিম তীরের একমাত্র খ্রিষ্টান অধ্যুষিত শহরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও জমি দখল বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাদের কৃষি জমি দখল, বাড়িঘরে হামলা এবং চলাচলে বাধা দেয়া হচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এসব চাপের কারণে তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হতে পারে। তবে বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা নিজেদের ভূমি ছাড়বেন না এবং টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাবেন
পশ্চিম তীরে সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় সমর্থন জার্মানির
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় জড়িত ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জার্মানি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, তারা এ ধরনের পদক্ষেপ সমর্থন করে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় জোটে নেয়া হবে। একই সাথে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।



