আরিফুল ইসলাম জিমন ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর)
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার মাইলা নদীর দেউলী ঘাটে একটি সেতুর দাবিতে তিন দশক ধরে অপেক্ষা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বারবার জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে ধর্ণা, আশ্বাস এবং কয়েকবার জরিপের পরও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি কাক্সিক্ষত সেতু। বরং প্রতি বর্ষায় জরাজীর্ণ বাঁশ-কাঠের সাঁকো হয়ে ওঠে এক ভয়ঙ্কর মরণফাঁদ। এই সাকের ওপর দিয়েই প্রতিদিন সাত থেকে ১০টি গ্রামের হাজারো মানুষ চলাচল করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সেতুর দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
এমনকি দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন সরেজমিন পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। কিন্তু সেই আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন আজও দেখা যায়নি।
খাইরুল গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা তারাপদ সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যৌবনকালে সেতুর আশা করছিলাম, এখন বয়সের ভারে সেই আশাও ছেড়ে দিয়েছি। কত সাংবাদিক এলো, কত কথা হলো, কিন্তু কিছুই হলো না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রবল স্রোতে অস্থায়ী সাঁকো ভেঙে যায়, কাঠ ভেসে যায়। তখন অনেক সময় বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে সাঁতরে নদী পার হতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থী, রোগী ও কৃষকেরা।
এলাকার শিক্ষার্থী নাসরিন আক্তার বলে, বর্ষাকালে সাঁকো দিয়ে স্কুলে যেতে খুব ভয় লাগে। প্রায়ই পড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
নদীর এক পার শ্যামপুর গ্রামের বাসিন্দা শচীন, শাহারুল ও বিষ্ণুসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রায় এক বছর আগে সরকারি কর্মকর্তারা এসে নদী এলাকায় মাটি পরীক্ষা করেন এবং কয়েক দিন অবস্থান করেন। তখন গ্রামবাসী ভেবেছিলেন, এবার হয়তো দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
উপজেলার ৩ নম্বর সিংড়া ইউনিয়নের মাইলা নদীর দেউলী ঘাটটি উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
প্রতিদিন এই পথ দিয়ে হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রোগী ও কৃষিপণ্য পরিবহনকারী মানুষকে ঝুঁকি নিয়েই পারাপার করতে হয়। কৃষকেরা জানান, বিকল্প পথে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ দিনের অবহেলা ও উন্নয়নবঞ্চনার কারণে জনদুর্ভোগ এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাধ্য হয়ে গ্রামবাসী নিজেরাই চাঁদা তুলে সাঁকোর দুই পাশে ঢালাই দিয়ে কোনোভাবে পারাপারের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে।
ঘোড়াঘাট উপজেলা প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, সেতু নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দফতরে একাধিকবার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রীকেও জানানো হয়েছে।
ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল আল মামুন কাউসার শেখ বলেন, এলাকার মানুষের দুর্ভোগ অনেক বেশি এবং সেখানে একটি সেতু অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাজ এগোচ্ছে না।
তিন দশকের অপেক্ষার পরও কাক্সিক্ষত সেতুর দেখা না পেয়ে এখন স্থানীয়দের প্রশ্ন- দেউলী ঘাটের মানুষের ভাগ্যে কি কখনো নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা জুটবে, নাকি আশ্বাসের সেতুতেই আটকে থাকবে তাদের ভবিষ্যৎ?



