গাজা শান্তি পরিষদের প্রথম বৈঠক ১৯ ফেব্রুয়ারি

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ইসরাইলি হামলায় গাজার পরিবহনব্যবস্থা ধ্বংস
  • ইসরাইলের বাধায় গাজায় মানবিক তীব্র বিপর্যয়
  • গাজা ও পশ্চিমতীরে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত

গাজা নিয়ে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে হোয়াইট হাউজ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা ‘শান্তি পরিষদের এটি হবে প্রথম বৈঠক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এর বরাতে রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে। খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা ও বোর্ডে থাকা চারটি দেশের কূটনীতিকদের বরাতে এই বৈঠকের কথা জানা গেছে। তবে পরিকল্পনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সময়সূচি বা কাঠামো বদলাতেও পারে বলে জানানো হয়েছে। বৈঠকটি ওয়াশিংটনের যুক্তরাষ্ট্র শান্তি ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকের ঠিক আগের দিন ১৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে হোয়াইট হাউজে বৈঠক করার কথা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। ফলে গাজা ইস্যুতে এই বৈঠককে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বাড়ছে। এই বৈঠক শুধু রাজনৈতিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। গাজা পুনর্গঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহও অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউজ ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। সমালোচকেরা এই বোর্ডকে জাতিসঘের বিকল্প একটি ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখছেন। বোর্ডে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার ও যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহি এ পরিকল্পনায় উপেক্ষিতই থাকছে।

ইসরাইলি হামলায় গাজার পরিবহনব্যবস্থা ধ্বংস

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় কয়েক বছর ধরে চালানো ইসরাইলি আগ্রাসনে উপত্যকাটির পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন বা ২৫০ কোটি ডলার। গতকাল শনিবার আল জাজিরার এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, প্রতিদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আল-নাবিহ বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট সংযোগসহ তার সাইকেলে ব্রিফকেস ও ল্যাপটপ বেঁধে একটি জায়গার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তার ছাত্রদের অনলাইনে যোগাযোগ করার উদ্দেশেই এমনটি করেন তিনি। গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসনের আগে একজন অধ্যাপকের সাইকেল চালানো কোনো সাধারণ দৃশ্য ছিল না। কিন্তু এখন যুদ্ধের কারণে আরোপিত একটি করুণ বাস্তবতার মধ্যে এক কাতারে এসে পড়েছেন গাজার ধনী-গরিব, শিক্ষার্থী-শিক্ষক, মালিক-চাকরিজীবী সবাই। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত গণপরিবহনের কারণে এখন বিকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম মাধ্যম সাইকেল।

আল-নাবিহ জানান, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজা শহরের শুজাইয়া পাড়ায় পার্কিং করার সময় তার গাড়িটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলাম আর তখন কাছাকাছি একটি ভবনে ইসরাইলি বিমান হামলা চালায়।’ এ সময় উভয় উইন্ডোস্ক্রিন ভেঙে পড়ে এবং ইঞ্জিনটি বিকল হয়ে যায় বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, ‘আমার গাড়িটি ব্যবহারের অযোগ্য এবং এখন জ্বালানি খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব, তাই আমাকে এভাবেই মানিয়ে নিতে হয়েছে।’ জ্বালানির অভাবে সাইকেল হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন। তবে সাইকেলের দাম যুদ্ধের আগে যেখানে ছিল ২০০ ডলারের নিচে, এখন তা ছাড়িয়েছে এক হাজার ডলার। কিছু ডেলিভারি সেবা সাইকেলনির্ভর হয়ে টিকে থাকলেও সীমিত সময়ের বেশি কাজ সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, পরিবহনব্যবস্থার এই ধ্বংস গাজার অর্থনীতি ও মানবিক সঙ্কটকে আরো গভীর করছে।

ইসরাইলের বাধায় গাজায় তীব্র মানবিক বিপর্যয়

ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসঙ্ঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ মাস ইসরাইল গাজায় তাদের মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিয়ে আসছে। ফলে খাদ্য, ওষুধসহ জরুরি সহায়তা সামগ্রী প্রতিবেশী দেশগুলোতেই আটকে রয়েছে। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ইউএনআরডব্লিউএ জানায়, খাদ্যসামগ্রী, স্বাস্থ্যবিধি কিট, ওষুধ এবং আশ্রয় উপকরণসহ তাদের মানবিক সহায়তার চালানগুলো গত কয়েক মাস ধরে মিসর ও জর্দানের গুদামগুলোতে সংরক্ষিত রয়েছে। এসব সহায়তা গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সংস্থাটি বলে, ‘ইউএনআরডব্লিউএ’র জীবনরক্ষাকারী সহায়তা প্রস্তুত আছে; কিন্তু মার্চ ২০২৫ থেকে তা গাজায় ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। সময় নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই।’ ২০২৪ সালের শেষ দিকে অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমে ইউএনআরডব্লিউএ’র কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে ইসরাইল। এরপর থেকে সংস্থাটির ওপর একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। ইসরাইলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন জানিয়েছেন, পূর্ব জেরুসালেমে ইউএনআরডব্লিউএ’র সদর দফতরে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নিজেই তিনি এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার তদারকি করেছেন।

গত বুধবার সন্ধ্যায় এক্সে দেয়া এক পোস্টে কোহেন বলেন, ‘কথায় ও কাজে আমি ইউএনআরডব্লিউএ’র জন্য পানি বন্ধ করে দিয়েছি।’ এর আগে একটি ইসরাইলি রেডিও স্টেশনে তিনি বলেন, ‘ইউএনআরডব্লিউএ’র স্থাপনাগুলোতে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা প্রত্যক্ষ করতে তিনি পূর্ব জেরুসালেমে যাচ্ছেন’ কোহেন বলেন, ‘ ইসরাইল রাষ্ট্রে ইউএনআরডব্লিউএর কোনো জায়গা নেই।’

গাজা ও পশ্চিমতীরে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত

কার্যকর যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে অবশিষ্ট ভবনগুলো বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। রাত ও ভোরের দিকে এসব বিস্ফোরণের শব্দ গাজার বহু এলাকায় শোনা যায়। একই সাথে গাজা সিটির পূর্বাংশ ও উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়ার পূর্ব এলাকায় হামলা চালানো হয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির। খবর অনুযায়ী, ইসরাইলি নৌযান থেকে রাফাহ ও খান ইউনুস উপকূলে গোলাবর্ষণ করা হয় এবং রাফাহর আকাশে হেলিকপ্টার থেকেও গুলি ছোড়া হয়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় ৫৭৪ ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ৫১৮ জন আহত হয়েছেন। সর্বশেষ, গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকায় ইসরাইলি গুলিতে ৩০ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি ফরজ ইব্রাহিম সালিম নিহত হন। এদিকে পশ্চিমতীরেও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। নাবলুসের কাসরা এলাকায় দখলদার ইসরাইলিরা অন্তত ৭০ বছর বয়সী জলপাই গাছ কেটে ফেলেছে। একই সাথে পূর্ব জেরুসালেমে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এক ফিলিস্তিনিকে নিজ বাড়ি ভাঙতে বাধ্য করেছে। জানুয়ারি মাসে পশ্চিমতীরে ইসরাইলি সেনা ও দখলদারদের মোট এক হাজার ৮৭২টি হামলার তথ্য দিয়েছে পিএলও-সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থা। ইউনিসেফ জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে গাজায় অন্তত ৩৭ শিশু নিহত হয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং শিশুদের জীবন এখনো মারাত্মক ঝুঁকিতে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, জ্বালানি, ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর তীব্র সঙ্কটে স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধের ৪৬ শতাংশ এবং চিকিৎসাসামগ্রীর ৬৬ শতাংশের মজুদ শূন্যে নেমে এসেছে। সীমিত সহায়তায় পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয় বলেও সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়।

সাংবাদিক ও বিদেশী কর্মী আটক

অধিকৃত পশ্চিমতীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হেবরনে অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নথিভুক্ত করার সময় দুই সাংবাদিক, দুই বিদেশি সংহতি কর্মী ও এক ফিলিস্তিনি বসতি-বিরোধী কর্মীকে আটক করেছে ইসরাইলি বাহিনী। স্থানীয় সূত্রের বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী ওসামা মাখামেরা জানান, হেবরনের দক্ষিণে মাসাফের ইয়াত্তা এলাকায় বসবাসকারীদের ওপর অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলার পর ইসরাইলি বাহিনী রুজুম আল-আলা এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় একটি বিদেশি গণমাধ্যমে কর্মরত দুই সাংবাদিক, দুই বিদেশী কর্মী এবং দক্ষিণ হেবরনে বসতি-বিরোধী জনপ্রিয় ও জাতীয় কমিটির সমন্বয়কারী রাতেব আল-জাবুরকে আটক করা হয়। মাখামেরা বলেন, আটক ব্যক্তিদের নিকটবর্তী একটি ইসরাইলি বসতিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আল-জাবুরকে ছেড়ে দেয়া হলেও সাংবাদিক ও বিদেশী কর্মীদের ভাগ্য এখনো অজানা।

প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পশ্চিমতীরে প্রায় চার হাজার ৭২৩টি বসতি-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং ১৩টি বেদুইন সম্প্রদায় বাস্তুচ্যুত হয়। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ২০২৪ সালে পশ্চিমতীরে ইসরাইলের দখলকে অবৈধ ঘোষণা করে সব বসতি অপসারণের আহ্বান জানায়।

‘বিশ্বব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে গাজাযুদ্ধ’

দোহায় অনুষ্ঠিত ১৭তম আল জাজিরা ফোরামে বিশ্বনেতারা সতর্ক করে বলেছেন, গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুধু ফিলিস্তিন নয়, বরং পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। বক্তারা বলেন, এই সঙ্ঘাত আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় কাঠামোর ভাঙনকে ত্বরান্বিত করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, ফিলিস্তিন প্রশ্ন মধ্যপ্রাচ্যের নৈতিক ও কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু। তার ভাষায়, ‘গাজায় যা ঘটছে, তা কেবল যুদ্ধ নয়, এটি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ধ্বংস।’তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাসহ লক্ষ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানান। আলজাজিরা নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান শেখ হামাদ বিন ছামির আলে ছানি বলেন, ইসরাইল গাজা ও পশ্চিমতীরের বাস্তবতা স্থায়ীভাবে বদলে দিতে চাইছে।

সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ সতর্ক করেন, আন্তর্জাতিক আইনের জায়গায় শক্তির রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তুরস্কের যোগাযোগ পরিচালক বুরহানুদ্দিন দুরান বলেন, গাজা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ‘ঐতিহাসিক ভাঙনের প্রতীক’। ফোরামে বক্তারা একমত হন যে, ন্যায়বিচার ছাড়া স্থিতিশীলতা সম্ভব নয় এবং গাজা যুদ্ধ এই সত্য আরো স্পষ্ট করে দিয়েছে।