- যার মগজ যেরকম, তার উপসংহার সেরকম : বিরোধীদলীয় নেতা
- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে নতুন করে বিভক্ত না করি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- ৫ আগস্টের পর পুলিশ হত্যার বিচার চাই : ফজলুর রহমান
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সরকারি দলের সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের দেয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে ফজলুর রহমান যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন দফায় দফায় ব্যাপক হৈ-হট্টগোল চলে। একপর্যায়ে অধিবেশনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকারকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কড়া হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাকালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের তুলনা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ফজলুর রহমান। এ সময় তিনি বলেন, বিরোধী দলের নেতা উনাকে আমি অসম্মান করি না, সবসময় ‘মাননীয়’ বলে কথা বলি। কিন্তু উনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে ‘ফজা পাগলা’ বলে। তারা নাকি সভ্য! তারা নাকি ইসলামের অনুসারী। বিরোধীদলীয় নেতা আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোট। আমার বয়স ৭৮ বছর।
এ পর্যায়ে স্পিকার তাকে প্রশ্ন করেন, আপনাকে কি কেউ এই ধরনের উক্তি করেছে? এরকম তো সংসদে কেউ বলেনি। জবাবে ফজলুর রহমান বলেন, করেছে। স্পিকার পুনরায় বলেন, আপনি কেন নিজের গায়ে টেনে নিচ্ছেন? ফজলুর রহমান তখন জোর দিয়ে বলেন, করেছে।
স্পিকার তাকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলে জামায়াতে ইসলামী ও মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে কঠোর মন্তব্য করেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, আচ্ছা, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন উনি মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের লোক। উনি জামায়াতে ইসলামী করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না। শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করা ডাবল অপরাধ।
তার এই মন্তব্যের পরপরই সংসদে ব্যাপক হট্টগোল শুরু হয়। বিরোধী দলের হট্টগোলের প্রতিবাদ জানাতে থাকেন সরকারি দলের সদস্যরা।
এ সময় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। তাদের কেউ কেউ ফজলুর রহমানকে উদ্দেশ করে ‘ফ্যাসিস্ট’, তিনি ‘অসুস্থ’, তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, আমাদের দলে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছে ইত্যাদি কমেন্ট করতে থাকেন। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা হই চই করতে থাকলে ফজলুর রহমান বক্তব্য প্রদানে বাধার মুখে পড়েন। এ সময় স্পিকার পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে বলেন, মাননীয় সদস্যকে বলতে দেন। সদস্যবৃন্দ আপনারা শৃঙ্খলা রক্ষা করুন। সদস্যবৃন্দ, সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করুন। তখন ফজলুর রহমান আবারো বলেন, আমি আবারো বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক তো জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করতেছে। বক্তব্যের যারা প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন তাদের দেখিয়ে তিনি বলেন, ওই দেখেন, তারা কী ধরনের আচরণ করছে।
এ সময় স্পিকার দাঁড়িয়ে যান। সংসদের হুইপরাও সদস্যদের থামানোর চেষ্টা করেন। তখন সংসদীয় রীতিনীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্পিকার বলেন, সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান, অপেক্ষা করুন। এটি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। এখানে প্রত্যেকেই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। দয়া করে বসুন। সারা জাতি দেখছে, লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। আমি প্রতিদিনই বলি যে ‘রুলস অফ প্রসিডিউর’ বইটা একটু পড়েন। যদি এই সংসদ বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না। তিনি বলেন, প্রত্যেকেরই বাকস্বাধীনতা আছে। সামান্য কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি করা ঠিক না। যদি সরকারি দলের কোনো সদস্যের বক্তব্যে আপত্তি থাকে, আপনারা পরে জবাব দিবেন। কিন্তু শিশুরাও লজ্জা পাবে এই ধরনের আচরণে।
এর পর ফজলুর রহমান আবারো বক্তব্য শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের শোক প্রস্তাব ও ইনডেমনিটি ইস্যুতে কথা বলেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সনের ১৪ ডিসেম্বরকে পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। সেই মুনীর চৌধুরী, আব্দুল আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার থেকে ধরে শত শত বুদ্ধিজীবীকে যারা হত্যা করেছিল তাদেরকে বলা হয় আল-বদর। আমি খুব দুর্ভাগা, এই হাউজে প্রস্তাব হয়েছে, তাদের ব্যাপারেও শোক প্রস্তাব হয়েছে। আমি একা হলেও এটা প্রতিবাদ করতাম। ইতিহাসে ভুল বার্তা যাবে যদি আমরা যুদ্ধাপরাধীর ব্যাপারে শোক প্রস্তাব নেই। তিনি আরো বলেন, পুলিশের ব্যাপারে যে ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে তুলনা করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ফজলুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ আর ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান এক নয়। হিমালয় পর্বতের সাথে টিলার যেমন তুলনা হয় না, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের সাথে ৫ আগস্টের তুলনা করাও অন্যায়। ৫ আগস্টের যোদ্ধাদের আমি ছোট করে দেখছি না। যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আমি নিজেও এই আন্দোলনে ছিলাম। শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত আমার যুদ্ধ চলবে বলেছিলাম। তাই বলে ৫ আগস্ট কোনো বিপ্লব নয়, এটি হলো গণ-অভ্যুত্থান। সেই গণ-অভ্যুত্থানকে যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তুলনা করতে চায়, আমি বলবো এটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধ মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম এক দিনে হয়নি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ১৯৭১ সনে শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, এ দেশের জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে, ততদিন মুক্তিযোদ্ধারা জিতবে।
৫ আগস্টের পর পুলিশ হত্যা ও থানা লুটের বিচার চাইলেন এমপি ফজলুর রহমান
৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা লুট ও পুলিশ হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করে সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পরের ঘটনাগুলো কোনোভাবেই আইনি ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) পাওয়ার কথা নয়। তিনি বলেন, পুলিশের ব্যাপারে যে ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছে, সেটা ৫ আগস্ট পর্যন্ত এক রকম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর এত থানা লুট হলো, এত পুলিশকে হত্যা করা হলো তারা তো তখন যুদ্ধ করেনি, তারা তো নিরপরাধ। এত অস্ত্র গেল কোথায়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, যদি ৫ আগস্টের পর কোনো পুলিশ হত্যা হয়ে থাকে, থানা লুট হয়ে থাকে, অস্ত্র লুট হয়ে থাকে সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত, সেটার বিচার হওয়া উচিত। পুলিশ সদস্যদেরও মানবাধিকার রয়েছে উল্লেখ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ৫ আগস্টের আগে পুলিশ যা করেছে তারা রাষ্ট্রীয়বাহিনী হিসেবে করেছে, তারা যদি অন্যায় করে থাকে তার বিচার হোক। কিন্তু আমি মনে করি তারাও এ দেশের নাগরিক, তাদেরও পরিবার আছে, তাদের সন্তানরাও এতিম হয়েছে। অন্তত রাষ্ট্রের তাদের কাছে গিয়ে বলা উচিত যে, তোমাদের সন্তান যেভাবেই নিহত হয়ে থাক, আমরা তোমাদেরকে দেখবো।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে ফজলুর রহমান বলেন, সিরাজউদ্দৌলা আর মোহাম্মদী বেগ কিন্তু এক না। তারা একই মায়ের দুধ পান করলেও মোহাম্মদী বেগ কিন্তু সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেছিল।
যার মগজ যেরকম, তার উপসংহার সেরকমই হবে- বিরোধীদলীয় নেতা
অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকারের অনুমতিতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমার পরিচয় নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে উনি গুরুতর অপরাধ করেছেন। ফজলুর রহমানের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, উনি মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা বলেছেন; কিন্তু নিজের অবদান বলতে গিয়ে আরেকজনের অবদানের ওপর হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে আঘাত করেছেন। আমি বলে থাকি আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য, উনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। ‘উনি বলেছেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। তাহলে কি ওনাকে জিজ্ঞেস করে দল করতে হবে? এটি আমার নাগরিক অধিকার। আমি কোন দল করব, কোন আদর্শ অনুসরণ করব এর ওপর হস্তক্ষেপ করার ন্যূনতম কোনো অধিকার রাষ্ট্র কিংবা সংবিধান কাউকে দেয় নাই। আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই। তিনি আমার পরিচয়ের ব্যাপারে কথা বলে গুরুতর অপরাধ করেছেন।
সংসদে সবার গঠনমূলক আচরণের প্রত্যাশা করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা খোলা মনে এই সংসদকে কার্যকর করার জন্য জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে কথা বলেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী একটা প্রস্তাব দিয়েছেন, আমরা সাথে সাথেই তা গ্রহণ করেছি। কিন্তু উনি (ফজলুর রহমান) এটাতে কী উপসংহার টানলেন? যার মগজ যেরকম, তার উপসংহার সেরকমই হবে। প্রবীণ এই রাজনীতিকের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশা করিনি। আমরা এখানে ভালো কিছু শিখতে এসেছি। কাউকে হিট করা বা গালি দেয়ার মাধ্যমে বড় কিছু অর্জন করা যাবে না। সাধারণত যুক্তি যখন ফুরিয়ে যায়, মাথা তখন গরম হয়ে যায়। একটা প্রবাদ আছে, রেগে গেলেন তো হেরেই গেলেন। আমরা সবাই মিলে হারতে চাই না, জিততে চাই। এ জন্য সবাই যেন মাথা ঠাণ্ডা রেখে যুক্তির সাথে সত্যনির্ভর কথা বলি। তা হলে সংসদের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হবে।
এর পর সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান ফ্লোর চাইলে তাকে উদ্দেশ করে স্পিকার বলেন, এখন আর কথা না বললেও চলে। সংসদ উত্তপ্ত হোক এটা আমরা চাই না।’ স্পিকার রুলিং দিয়ে বলেন, ফজলুর রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে অসংসদীয় কোনো কিছু থাকে, সেটা এক্সপাঞ্জ করা হবে।
নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এর পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাইলে স্পিকার জানতে চান, তিনি কোন বিষয়ের ওপর বলবেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি করব না, সংসদের স্বার্থে। যে অ্যাটমসফিয়ারে আমরা এখানে আলাপ-আলোচনা করি, মাঝেমধ্যে সেটা কিছু উত্তেজনা সৃষ্টি হবেই, সেটা স্বাভাবিক। ফজলুর রহমান ‘ইতিহাসে সমৃদ্ধ’ প্রবীণ সংসদ সদস্য। আমরা এখন ভূগোলে আছি। আমরা বেশি ইতিহাস চর্চা করতে গেলে মাঝেমধ্যে কিছু ব্যত্যয় হবে। আমার মনে হয়, নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি। সংসদের কার্যক্রম এমনভাবে চালাতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং জুলাই যোদ্ধারা বুঝতে পারে, জাতির প্রত্যাশা পূরণের জন্য সংসদ সদস্যরা এখানে আছেন।



