চৌর্যবৃত্তিতে অভিযুক্তকে নিয়োগ দিতে তোড়জোড়

ঢাবির ফারসি বিভাগ

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিবেচনার প্রভাব নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপক নিয়োগকে কেন্দ্র করে উঠেছে গুরুতর বিতর্ক। প্রবন্ধে চৌর্যবৃত্তি ও গবেষণা-জালিয়াতিতে অভিযুক্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: আতাউল্যাহকে নিয়োগ দিতে একটি পক্ষ তৎপর বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত ১২ মে ঢাবিতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক রথ্যাঙ্কিংয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ। মেধা ও গবেষণার পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিকরণকে প্রাধান্য দেয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফারসি বিভাগের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ যেন সেই বক্তব্যকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপক পদে আবেদন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো: আতাউল্যাহ। তবে তার বিরুদ্ধে গবেষণা-জালিয়াতি ও চৌর্যবৃত্তির একাধিক অভিযোগ ইতোমধ্যে বিভাগের চেয়ারম্যানের দফতরে পৌঁছেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ড. আতাউল্যাহ রচিত ১৬টি গবেষণা প্রবন্ধের মধ্যে অন্তত ছয়টি তার পিএইচডি থিসিস থেকে হুবহু কপি-পেস্ট করে প্রকাশ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক গবেষণা নীতিমালার পরিপন্থী।

অভিযোগের সমর্থনে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস বিভাগীয় চেয়ারম্যানের অফিসিয়াল ই-মেইলে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া গত ১১ মে স্বশরীরে অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথিও জমা দেয়া হয় বিভাগীয় চেয়ারম্যান এবং সি অ্যান্ড ডি কমিটির সদস্যদের কাছে।

অভিযোগ রয়েছে, কলা অনুষদের ডিন ও সি অ্যান্ড ডি কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. মো: আবুল কালাম সরকারের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কারণেই ড. আতাউল্যাহকে নিয়োগ দিতে একটি পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ‘বন্ধু কোটায়’ তাকে নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা চলছে। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী অধ্যাপক পদে আবেদনের জন্য ন্যূনতম ১২টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রয়োজন। অথচ চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত ছয়টি প্রবন্ধ বাদ দিলে ড. আতাউল্যাহর বৈধ প্রকাশনার সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টিতে। ফলে তিনি বিজ্ঞপ্তির শর্ত পূরণ করেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আরো জানা গেছে, ড. আতাউল্যাহর প্রকাশিত ১৬টি প্রবন্ধের মধ্যে ১৪টিই বাংলা ভাষায় এবং মাত্র দু’টি ফারসি ভাষায় রচিত। ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে দীর্ঘ শিক্ষকতা করলেও ইরান থেকে তার কোনো গবেষণা প্রকাশনা নেই। এমনকি তার পিএইচডি থিসিসও বাংলায় রচিত। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো গ্রন্থও প্রকাশ করতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভাগের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, তিনি ফারসি ভাষায় সাবলীল নন; শুদ্ধভাবে বলা ও লেখায়ও তার দুর্বলতা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুমিত আল রশিদ বলেন, “যে ডকুমেন্টসগুলো এসেছে, সেগুলো চেয়ারম্যান ও সি অ্যান্ড ডি কমিটি বরাবর পাঠানো হয়েছে।

আমরা এখনো জানি না ভিতরে কী আছে। আর ই-মেইলে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো সি অ্যান্ড ডি কমিটির সদস্যদের ফরওয়ার্ড করা হয়েছে। আমি দুজন সি অ্যান্ড ডি সদস্যের সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, তাদের বিষয় নয়; ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিষয়। তবে অভিযোগ আকারে এলে আমরা বিষয়টি বিবেচনা করতাম।” তিনি আরো বলেন, “ড. আতাউল্যাহর ১৬টি প্রবন্ধের মধ্যে ছয়টি প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যেটা আমরা পত্রপত্রিকায় দেখেছি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী ১২টি প্রবন্ধ প্রয়োজন, কিন্তু তার থাকে ১০টি।”

চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যেই কার্যত স্পষ্ট হয়েছে যে, অভিযোগে থাকা প্রবন্ধগুলো বাদ দিলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত পূরণ হয় না। এ বিষয়ে কলা অনুষদের ডিন ও সি অ্যান্ড ডি কমিটির সদস্য ড. মো: আবুল কালাম সরকার বলেন, “সিলেকশন বোর্ডে ৮-৯ জন সদস্য থাকেন। সেখানে আমি একজন মাত্র। আমি একা কিভাবে কাউকে নিয়োগ দেবো? যদি প্লেজিয়ারিজম থাকে, নিয়মের মধ্যে না হয়, বিধিবহির্ভূত হয়, তাহলে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়টি দেখবে। এটি তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।”

ড. আতাউল্যাহ সম্পর্কে তার মন্তব্য, “তিনি ২৪-২৫ বছর ধরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। নিশ্চয়ই নিয়ম মেনেই করছেন।”

এদিকে শূন্যপদে আবেদন করা অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আবু মুসা মো: আরিফ বিল্লাহ। ফ্যাসিবাদী আমলে নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে বাধ্য হন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী তিনি আবার আবেদন করার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।

জীবনবৃত্তান্ত থেকে জানা যায়, তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সোয়াচ’ থেকে পিএইচডি করেছেন। অধ্যাপনা ও গবেষণা করেছেন ইংল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে। জাপান, কোরিয়া, ইংল্যান্ড, ইরান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে তার অর্ধশতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ এবং ১৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি ইংল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।