কূটনৈতিক প্রতিবেদক
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি পদের নির্বাচনে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনটি নিউ ইয়র্ক সময় আগামীকাল মঙ্গলবার জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে বাংলাদেশে প্রার্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন সাইপ্রাসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস। এশিয়া-প্যাসেফিক গ্রুপের এই নির্বাচন থেকে ফিলিস্তিন সরে যাওয়ায় এখন বাংলাদেশের সাথে সাইপ্রাসের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। নির্বাচিত প্রার্থী সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন, যার কার্যক্রম ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বনেতাদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক।
৮১তম অধিবেশনের জন্য ইউএনজিএর সভাপতি নির্বাচনে জয়ী হতে হলে একজন প্রার্থীকে ভোটদানকারী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রদত্ত ভোটের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে। জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের সঠিক সংখ্যা নির্ভর করে জাতিসঙ্ঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে কয়টি রাষ্ট্র উপস্থিত থেকে সক্রিয়ভাবে বৈধ ভোট দিচ্ছে, তার উপর। ইউএনজিএ কার্যপ্রণালী বিধি অনুসারে, ‘উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্য’ বলতে শুধুমাত্র সেইসব সদস্যদের বোঝায় যারা হ্যাঁ বা না ভোট দিয়ে থাকে। গোপন ব্যালটের ভোটের সময় বিরত থাকা বা অনুপস্থিত থাকা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণের সময় গণনা করা হয় না। এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘ সনদের ১৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতিসঙ্ঘে আর্থিক বকেয়ার কারণে ভোটদানে নিষিদ্ধ কোনো দেশকেও বাদ দেয়া হয়।
যদি ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রই উপস্থিত থেকে ভোট দেয়, তবে জয়ের জন্য প্রযোজনীয় ভোটের সীমা হলো ৯৭। কমসংখ্যক রাষ্ট্র ভোট দিলে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের সংখ্যাও সেই অনুযায়ী কমে যায়। আর্থিক বকেয়ার কারণে আফগানিস্তান, বলিভিয়া, ভেনিজুয়েলা, কঙ্গো, ইকুয়েডরসহ আটটি দেশ বর্তমানে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে ভোটদান থেকে নিষিদ্ধ রয়েছে। সে হিসাবে ইউএনজিএর সভাপতি পদে জয়ী হতে প্রয়োজন হবে ৮৯ ভোট। বাংলাদেশ এই নির্বাচনে অন্তত ৭২টি দেশের ভোট নিশ্চিত করেছে। এর বাইরে দোদুল্যমান রাষ্ট্রগুলোর ভোট রয়েছে। তাই সার্বিকভাবে নির্বাচনে বাংলাদেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নেন আগের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের কিছু দিনের মধ্যেই তিনি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনের জন্য সক্রিয় তৎপরতা শুরু করেন। সরকার গঠনের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় খলিলুর রহমান ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) নির্বাহী কমিটির জরুরি সভায় যোগ দিতে প্রথম বিদেশ সফরে সৌদি আরব যান। এই সভার সাইডলাইনে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে জাতিসঙ্ঘ সাধারন পরিষদের সভাপতি পদের লড়াই থেকে সফলভাবে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী কমনওয়েলথ মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় যোগ দিতে লন্ডন এবং ভারত মহাসাগর সম্মেলনে যোগ দিতে মরিশাস সফরের সময় সাইডলাইন বৈঠকগুলোতে তার প্রার্থিতার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। তুরস্ক সফরের মধ্য দিয়ে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর শুরু করেন, যার সাথে সাইপ্রাসের রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। এ ছাড়া ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাসেলস এবং ইথিওপিয়া সফরের সময় দ্বিপক্ষীয় ইস্যুর পাশাপাশি খলিলুর রহমান নিজ প্রার্থিতার পক্ষে সমর্থন চেয়েছেন। ইউএনজিএর সভাপতি পদে নির্বাচনের কাজে তিনি গত মাসের মাঝামাঝি থেকেই নিউ ইয়র্ক অবস্থান করছেন। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও ইউএনজিএতে বাংলাদেশের প্রার্থিতার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সব দূতাবাস ও হাইকমিশনকে এ জন্য কাজে লাগানো হয়েছে। ঢাকায় সব বিদেশী মিশন প্রধানদের কাছে সমর্থন চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদটি যেহেতু এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের আওতায়, তাই ইউরোপীয় রাষ্ট্র হওয়ায় সাইপ্রাসের প্রার্থিতা নিয়ে কিছু দেশের আপত্তি রয়েছে, যা বাংলাদেশের পক্ষে যেতে পারে।
পূর্ণকালীন সভাপতি হওয়া নিয়ে বিতর্ক : গত ১৩ মে নিউ ইয়র্কে সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে প্রার্থীদের সাথে জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একটি অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময় সংলাপ হয়। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, নির্বাচিত হলে আমি কোনো পক্ষের নয়, সবার জন্য সমানভাবে গ্রহণযোগ্য একজন নিরপেক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ সভাপতি হবো। জাতিসঙ্ঘ সনদ সমুন্নত রাখা, ছোট দেশগুলোর কণ্ঠস্বর জোরদার করা এবং বৈশ্বিক মতপার্থক্যের মধ্যেও ঐকমত্য গড়ে তোলাই হবে আমার প্রধান লক্ষ্য।
এ সময় তিনি সাধারণ পরিষদের পূর্ণকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরিকল্পনার কথাও জানান। এ ব্যাপারে অ্যান্ডোরার প্রতিনিধি জানতে চেয়েছিলেন, সাধারণ পরিষদের পূর্ণকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হলে তাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে কি না। জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, পদত্যাগই একমাত্র বিকল্প নয়। বরং তিনি ছুটিতেও যেতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন যে পূর্ণকালীন দায়িত্ব হিসেবে এই পদটি গ্রহণের জন্য তাকে এক বছরের জন্য রেহাই দেয়া হবে।
এ ব্যাপারে সাবেক এক কূটনীতিক বলেন, জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বটি মূলত পূর্ণকালীন। সদস্যরাষ্ট্রগুলো এ পদে একজন পূর্ণকালীন সভাপতিই আশা করে। এই পদের জন্য সাধারণত বিভিন্ন দেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মনোনীত করা হয়ে থাকে। তবে দায়িত্বে থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলে কেউ সভাপতি হতে পারবেন না, জাতিসঙ্ঘের সনদে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। ইতঃপূর্বে মালদ্বীপের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই সাথে দু’টি দায়িত্বই সফলভাবে পালন করেছিলেন। তবে এ জন্য তাকে বেশির ভাগ সময় নিউ ইয়র্কে কাটাতে হয়েছিল। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সাধারণ পরিষদের সভাপতির ব্যস্ততা অনেক বেশি। তাকে বিভিন্ন দেশ সফর করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ‘পূর্ণকালীন’ সময় দিতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই এটা নিয়ে বির্তক থাকাটা স্বাভাবিক। বর্তমান সরকারের সামনে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কে ভারসাম্য বজায় রাখার একটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ ছাড়া ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমনের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিও নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। খলিলুর রহমান ইউএনজিএর সভাপতি নির্বাচিত হলে সরকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব কাকে দিয়ে কিভাবে সামলাবেন- তা এখন দেখার বিষয়।



