গাজায় ইসরাইলি হামলা আরো বেড়েছে

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে সহিংসতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। সংস্থাটির তথ্য মতে, আগের সপ্তাহের তুলনায় উপত্যকাটিতে হামলা প্রায় অর্ধেক বা ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরে জাতিসঙ্ঘ। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

জাতিসঙ্ঘে মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মাঠপর্যায়ে আমাদের অংশীদাররা জানিয়েছে যে ১২ থেকে ১৮ এপ্রিলের মধ্যে গোলাবর্ষণ এবং বিমান হামলার মতো ঘটনা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক হামলার রেকর্ড। ডুজারিক আরো জানান, উত্তর গাজা, গাজা এবং দেইর আল বালাহ প্রদেশে হামলার মাত্রা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।

মানবিক সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, গাজাজুড়ে অবিস্ফোরিত বোমার হুমকি মোকাবেলায় বাধা সৃষ্টি করছে বিভিন্ন বিধিনিষেধ। তিনি জানান, মাইন অপসারণকারী কর্মীরা হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিককে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তবে এই হুমকি আরো কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার জন্য বিশেষ সরঞ্জাম প্রবেশ এবং পুরোপুরি অপসারণ কার্যক্রম প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। মুখপাত্র বলেন, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রবেশে সীমাবদ্ধতাসহ অন্যান্য বিধিনিষেধ সামগ্রিক মানবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে চলেছে।

গাজার মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ইসরাইল চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে এসব হামলা চালাচ্ছে। চুক্তির পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী হত্যা, গ্রেফতার, অবরোধ এবং অনাহারের মতো দুই হাজার ৪০০টি ঘটনা ঘটিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, সোমবার পর্যন্ত এসব লঙ্ঘনের ঘটনায় ৭৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং দুই হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছেন।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরাইলের বর্বরোচিত যুদ্ধের দুই বছর পর এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। ওই যুদ্ধে ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন। এ ছাড়া গাজার বেসামরিক অবকাঠামোর ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে যায়। মানবিক বিষয়াদি সমন্বয়কারী কার্যালয়ের (ওচা) বরাত দিয়ে ডুজারিক দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সহিংসতার উদ্বেগজনক পরিস্থিতিও তুলে ধরেন। তিনি জানান, বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইসরাইলি বাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ৩৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৭৯০ জন আহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ৫৪০টির বেশি হামলায় হতাহত ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হওয়া হামলার তদন্ত করতে হবে এবং বেসামরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দখলদার শক্তি হিসেবে ফিলিস্তিনি জনগণকে রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা ইসরাইলের রয়েছে উল্লেখ করে ডুজারিক আরো বলেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী অপরাধীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

পশ্চিমতীরে ইসরাইল ও দখলদারদের হামলা

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনী ও দখলদারদের পৃথক হামলায় দুই শিশুসহ অন্তত ৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের। রামাল্লাহর পূর্বে আল-মুঘাইয়ির শহরে দখলদারদের গুলিতে ১৪ বছর বয়সী আউস হামদি আল-নাসান ও ৩২ বছর বয়সী জিহাদ মারজুক আবু নাঈম নিহত হন। একই ঘটনায় আরো তিনজন আহত হন। স্থানীয় সূত্র জানায়, দখলদাররা শহরের উপকণ্ঠে ঢুকে বাসিন্দাদের ওপর গুলি চালালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ দিকে উত্তরাঞ্চলের জেনিন শহরে আগের এক অভিযানে গুলিবিদ্ধ ৪৯ বছর বয়সী রাজা ফাদেল বেইতাউই মারা যান। দক্ষিণের হেবরনে ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাজদি আল-জাবারি এক ইসরাইলি দখলদারের গাড়িচাপায় নিহত হন। গ্রামবাসীরা জানান, সাম্প্রতিক এক হামলার পর থেকে আল-মুঘাইয়ির অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে, যা স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। এ ছাড়াও অধিকৃত পশ্চিমতীরের নাবলুস এলাকায় ইসরাইলি দখলদাররা একাধিক হামলা চালিয়ে একটি বাড়ি ও দু’টি যানবাহনে আগুন দিয়েছে এবং শতাধিক জলপাই গাছ কেটে ফেলেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বেইত ইমরিন গ্রামের কাছে দখলদাররা হানা দিয়ে বাড়ি ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই বাসিন্দারা তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় কয়েকজন দগ্ধ ও ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন, যাদের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে নাবলুসের আল-লুব্বান আল-শারকিয়া এলাকায় ১৫০টির বেশি জলপাই গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে একই অঞ্চলে কৃষিজমি ধ্বংস ও গাছ উপড়ে ফেলার ঘটনাও বেড়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, এসব হামলা শুধু সম্পদের ক্ষতি নয়, তাদের জীবিকা ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিমতীরে সহিংসতা বেড়েছে। এ সময় অন্তত ১,১৫০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত ও প্রায় ১১,৭৫০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়াও ২২ হাজার মানুষ আটক হয়েছেন। এ দিকে গাজা উপত্যকায়ও যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ হামলায় একজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং দুইজন আহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে। উত্তর গাজার জাবালিয়ার পূর্বে একটি সড়কে হামলার ঘটনায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি সামরিক যান থেকে গোলাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।

দক্ষিণের খান ইউনুস এলাকাতেও ভারী গুলিবর্ষণ চালানো হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এসব হামলা চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতির পর এখন পর্যন্ত ২,৪০০-এর বেশি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৭৮০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং দুই হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ সঙ্ঘাতে গাজায় ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে বলে জানানো হয়।

আল-আকসা মসজিদে দখলদারদের অনুপ্রবেশ, বাড়ছে উত্তেজনা

অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসরাইলি দখলদারদের অনুপ্রবেশ ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বুধবার বহু দখলদার ভারী পুলিশ পাহারায় মসজিদে প্রবেশ করে ধর্মীয় আচার পালন করে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।

তারা মসজিদের বিভিন্ন প্রাঙ্গণে ঘোরাফেরা করে এবং উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালায়। একই সময়ে মসজিদে প্রবেশে ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এপ্রিলের শুরু থেকে এ ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দখলদারদের বিভিন্ন গোষ্ঠী আরো বেশি প্রবেশের আহ্বান জানাচ্ছে বলেও জানা গেছে। মুসলমানদের কাছে আল-আকসা মসজিদ তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করে আসছে, ইসরাইল পূর্ব জেরুসালেমের আরব ও ইসলামী পরিচয় মুছে ফেলতে পরিকল্পিতভাবে এসব কার্যক্রম চালাচ্ছে।

আবারও প্রস্তুত ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’

গাজায় অবরোধ ভেঙে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ তাদের নতুন অভিযানের প্রস্তুতি জোরদার করছে। ইতালিতে কর্মীরা চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। খবর আনাদোলু এজেন্সির। এই উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের স্বেচ্ছাসেবক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও কর্মীরা অংশ নিচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য হলো খাদ্য, চিকিৎসা সহায়তা এবং পুনর্গঠনে সহায়তা পৌঁছে দেয়া। অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, গাজায় সঙ্কট এখনো অব্যাহত থাকায় এই উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। তারা এটিকে অহিংস নাগরিক আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, ভয় থাকলেও আমরা বিশ্বাস করি এটি একটি সঠিক কাজ। আরেকজন ফিলিস্তিনি প্রশিক্ষক জানান, বিশ্বজুড়ে মানুষের অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এটি শুধু সহায়তা নয়, বরং ফিলিস্তিনের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতির প্রকাশ।