সোনারচরের দক্ষিণে আরো দুই নতুন চর

নতুন এই মেছেরের চর জোয়ারের সময় ডুবে যায়। আর ভাটার সময় জানান দেয় অস্তিত্বের। কোনো গাছ পালা নেই। বৃক্ষ রোপণের মতো পরিবেশ এখনো হয়নি সেখানে। যদি এই মিছিরেরচর শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে তাহলে এখানে বনায়ন হবে। পশু পাখির আবাসস্থল হবে। আর পর্যটকদের জন্যও নতুন ভেনু হবে ভ্রমণের।

Printed Edition
সোনারচরের দক্ষিণে জেগে উঠা নতুন চর  : নয়া দিগন্ত
সোনারচরের দক্ষিণে জেগে উঠা নতুন চর : নয়া দিগন্ত

রফিুকল হায়দার ফরহাদ চর মোন্তাজ পটুয়াখালী থেকে ফিরে

‘ভাই তাড়াতাড়ি ট্রলারে উঠেন। দেরি করলে কিন্তু জোয়ারের কারণে যেতে সমস্যা হবে।’ ২০২৩ সালে রে চরের শুঁটকিপল্লী থেকে সাগরের যে অংশ দিয়ে ফিরছিলাম তখন এটা ছিল মাঝির সতর্কবার্তা । ২০২২ সালেও এই শুঁটকিপল্লীর সামনের সাগরের অংশ দিয়ে ভরা পানিতে অবলীলায় চলছিল আমাদের বহনকারী ট্রলার। অথচ এবার ভিন্ন চিত্র। আমরা মায়াচর এবং রুপারচর হয়ে সোনারচরের এই শুঁটকিপল্লীর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়তো হতবাক। সাগরের এই অংশ কোথায়? সাগরের এই অংশ যেন পরিণত হয়েছে খালে। কারণ শুঁটকিপল্লীর একটু পশ্চিম দিকেই জেগেছে নতুন এক চর। এই চরের কারণেই শুঁটকিপল্লীর পাশের এই সাগরের অংশ পরিণত হয়েছে বড় একটি খালে। আমাদের ট্রলার এবং অন্য ট্রলারগুলো একটু আস্তে আস্তেই অতিক্রম করছিল সেই এলাকা। কারণ ডুবোচর। নতুন চরের অংশ যে এখানেও বিস্তৃত হয়েছে। মাঝি শহীদুল হাওলাদার জানান, আগে মেছের মাঝি এই এলাকায় মাছ ধরতেন। তাই এই এলাকায় জেগে উঠা চরের নাম রাখা হয়েছে মেছেরের চর।

নতুন এই মেছেরের চর জোয়ারের সময় ডুবে যায়। আর ভাটার সময় জানান দেয় অস্তিত্বের। কোনো গাছ পালা নেই। বৃক্ষ রোপণের মতো পরিবেশ এখনো হয়নি সেখানে। যদি এই মিছিরেরচর শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে তাহলে এখানে বনায়ন হবে। পশু পাখির আবাসস্থল হবে। আর পর্যটকদের জন্যও নতুন ভেনু হবে ভ্রমণের। সবচেয়ে বড় বিষয় এই নতুন চর এবং সোনারচরের মধ্যের সাগরের অংশকে যেভাবে বড় খালে (ছোট নদী) পরিণত করেছে তা এক সময় জেলেদের মাছ ধরা শেষে আশ্রয় বা ঝড়ের সময় নিরাপত্তার একটি স্থান হবে। সোনারচরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া বড় খাল এখন জেলেদের তেমনই এক নিরপাদ আশ্রয়স্থল। আবার গভীরতা কমে গেলে নৌযান চালাচলই কঠিন হয়ে যাবে। মান্তা সম্প্রদায়ের মাঝি আবদুর রশীদ জানান, এই মেছেরেরচর এবারই বেশি জেগেছে। আগে শীতকালে হালকা দেখা যেত। বর্ষায় পানির নিচেই অবস্থান থাকত। হয়তো আগামীতে আরো বড় আকার ধারণ করবে।

এই মিছিরেরচরের সামনেই আরেকটি চরের সন্ধান পেলাম। সোনারচর থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে হবে এই চরের অবস্থান। এটিও নতুন চর। বর্ষায় থাকে পানির নিচে। আর শীতকালে জেগে উঠে। শীতকালে জোয়ারের সময়ও হালকা দেখা যায়। কয়েক কিলোমিটার লম্বা হবে এই নতুন চর। তবে এখনো কোনো নাম দেয়া হয়নি। আমাদের খুব ইচ্ছে ছিল এই নতুন চরে যাওয়ার।

কারণ চরের পশ্চিম অংশে কিছু পাখির উপস্থিতি দেখা যাচ্ছিল। বেশ বড় আকারের পাখিগুলো। মাঝি শহীদুলেরও প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল সেখানে যাওয়ার। কিন্তু ভাটার কারণে পানি কম থাকায় ট্রলার আর এগোচ্ছিল না। এই সব ক্ষেত্রে ছোট নৌকা সাথে রাখা লাগে। যা যাত্রীদের টেনে নিতে পারে তীর পর্যন্ত। আমাদের সাথে ছিল না সেই ছোট নৌকা। এর পরও শহীদুল প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন সেখানে যাওয়ার। এমন পরিস্থিতিতে পানিতে নেমেও পার হওয়া যায়। হাঁটু পানি হাঁটলেই চলে। সময় একটু বেশি লাগলেও নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় মেনে নেয়া যায় কষ্ট। তবে এই ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পানির নিচের কাদা। মাঝি শহীদুল ট্রলারের পাশে পানিতে বাঁশ গেঁথে গেঁথে দেখালেন কাদার নিচেই দেবে যাবে হাঁটু পর্যন্ত। এভাবে কাদা ডিঙ্গিয়ে নতুন এই চরে যাওয়া সম্ভব নয়। এরপর আমরা চরটির পূর্ব দিক থেকে ট্রলার চালিয়ে পশ্চিম দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। সেখানে চরের সরু একটি মাথা দেখা যাচ্ছিল। সাধারণত এমন স্থান দিয়ে চরের কাছে যাওয়া যায়। যেমনটা আমরা শিবচর, মায়াচর এবং চর তুফানিয়াতে গিয়েছিলাম। তবে এই নতুন চরের ওই অংশেও আমাদের ট্রলার যেতে পারল না। ফলে চরে নামতে না পারার কষ্ট নিয়েই ফিরে আসতে হলো। তবে আমাদের চরের কাছাকাছি যেতে দেখেই উড়ে চলে গেল পাখিগুলো। অবশ্য এই সুযোগে শহীদুল মাঝি সেই কোমড় পানিতে নেমে গোসলও সেরে ফেললেন।

আমরা এই চর থেকে ফেরার সময়ই মেছেরের চর দেখেছি। তখন বিকেল ৪টার বেশি বেজে গেছে। মেছেরের চর ও সোনারচরে মাঝখান দিয়ে আমরা যখন বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর মোহনায় এলাম তখন হতবাকই হতে হলো। তিনটি ডুবোচর সেখানে। আমরা আগের রাতে যখন চর হেয়ারে ট্রলারে ছিলাম তখন জোয়ারের কারণে এই ডুবোচরগুলো চোখে পড়েনি। ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৫ সালে এই মোহনা দিয়ে সোনারচর থেকে পশ্চিমের চর হেয়ারে নির্বিঘেœই গেছি। তবে এবার এই চরগুলোর জন্য সাবধানেই এবং চরের বাঁক দিয়ে আস্তে আস্তেই ট্রলার চালাতে হয়েছিল মাঝিকে। হয়তো এক সময় এই বুড়া গৌরাঙ্গ নদী ভরাটই হয়ে যাবে। যার প্রভাব পড়বে আশপাশের এলাকায়। বিঘœ ঘটবে নৌ চলাচলে। শহিদুল মাঝি জানালেন অদূর ভবিষ্যতে হয়তো শীতকালে বুড়া গৌরাঙ্গ নদী হেঁটেই পার হতে পারব।