দুর্বৃত্তরা বেপরোয়া

র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা বাড়ছে

এস এম মিন্টু
Printed Edition

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার মাদককারবারি ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিলেও দিন দিন আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে দুর্বৃত্তরা। সাধারণ মানুষের জান-মাল নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যারা দায়িত্ব পালন করে আসছেন দুর্বৃত্তরা খোদ তাদের ওপরই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সেনাবাহিনীও মাঠে কাজ করছে। তারপরও হঠাৎ কেন বেপরোয়া হয়ে উঠছে দুর্বৃত্তরা?

পুলিশ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে বলেন, পুলিশ আক্রান্ত হলে আইনের প্রয়োগ খুব কম হচ্ছে, যা অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন মাঠে চাইলেও পুলিশ শক্ত অবস্থান নিতে পারে না অনুমতি না পাওয়ায়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেয়ার পর গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসে নির্বাচিত বিএনপি সরকার; কিন্তু এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি চোখে পড়ছে না। খুন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তাবাহিনী যদি অনিরাপদ হয় তাহলে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে কে? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তাও ব্যাপকভাবে জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে যৌথ বাহিনীকে একযোগে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে অভিযান চালিয়ে তাদের দুর্গ ভাঙতে হবে। তা না হলে দুর্বৃত্তরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশের কিছুদিনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে অপরাধীদের মধ্যে যে বেপরোয়া মনোভাব তৈরি হয়েছিল, তা রয়ে গেছে। অপরাধীদের এমন আচরণের ক্ষেত্রে ‘মব সংস্কৃতির’ও দায় রয়েছে। পুলিশের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে।

পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশ বাহিনী আগের মতো কঠোর ভূমিকায় যেতে না পারায় অপরাধীরা সেই সুযোগ নিচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে হারানো মনোবল এখনো পুরোপুরি ফিরে পাননি অনেক পুলিশ সদস্য। এটিও পুলিশের কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলছে।

গত মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর এলাকায় মাদককারবারি ও সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে র‌্যাবের তিন সদস্য গুরুতর আহত হন। প্রকাশ্য দিবালোকে তাদের নৃশংসভাবে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হলেও উদ্ধারের জন্য আশপাশের লোকজন কেউ এগিয়ে আসেনি। এর আগেও সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের চনপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় পুলিশ অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ওপর একের পর এক হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

মঙ্গলবার রাতে খুলনায় এক আসামিকে ছিনিয়ে নিতে গুলি করে আহত করে দুর্বৃত্তরা। এরপর তাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নিয়ে আসার পথে ফের গুলি করা হয়। এ ঘটনার পর খুলনা শহর এলাকাজুড়ে আতঙ্কের মধ্যে পড়েন সাধারণ মানুষ।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি কিছুটা ধীরগতিতে হচ্ছে। এক দিকে মনোবল হারানো পুলিশ বাহিনী, অন্য দিকে অপরাধীদের বেপরোয়া আচরণ- দুইয়ের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে মাদককারবারি ও সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের ধরতে নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আমরা সেভাবেই নিয়মের মধ্যে থেকে অভিযান পরিচালনা করছি।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযানে যাওয়া পুলিশ দলের ওপর হামলার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার র‌্যাবের তিন সদস্যের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। তার আগে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে নারায়ণগঞ্জের পুরান বন্দরে ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্তে যাওয়া পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালায় সঙ্ঘবদ্ধ ১০-১৫ জন। তারা দুই পুলিশ সদস্যকে ছুরিকাঘাত করে একটি শটগান ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এর আগে গত এপ্রিল মাসে ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে আসামি ধরতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলায় পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। হাতকড়া পরানো আসামিকেও ছিনিয়ে নিয়ে যায় তার সমর্থকরা। এর কয়েক দিন আগে বাগেরহাটে গ্রেফতারি পরোয়ানার এক আসামিকে ছিনিয়ে নিতে এক পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে জখম করে তার সহযোগীরা। ওই মাসেই যশোরের কেশবপুরে মাইকিং করে লোক জড়ো করে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামিকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। শুধু অভিযানে যাওয়া পুলিশ সদস্যদের ওপর নয়, এপ্রিলে সিলেট নগরে সড়কে ট্রাফিক পুলিশের ওপরও হামলা হয়েছে। সিলেটের এয়ারপোর্ট থানার বাইপাস পয়েন্টে গাড়ির কাগজপত্র দেখতে চাওয়ায় পুলিশ সদস্য খসরু হাসান হামলার শিকার হন। ২৬ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে ইঞ্জিন অয়েল নিতে গিয়ে এক কনস্টেবল স্থানীয় এক রাজনৈতিক দলের নেতার হাতে মারধরের শিকার হন। ১৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জে মাদককারবারিদের ধরতে গিয়ে এক এসআই ও এক কনস্টেবল হামলার শিকার হন, তাদের মোবাইল ফোন এবং মানিব্যাগও ছিনিয়ে নেয় হামলাকারীরা।

অপর দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একের পর এক খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত হচ্ছে দেশীয় অস্ত্র। এতে আতঙ্কে রয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। স্থানীয়দের ভাষ্য, হঠাৎ করেই মোহাম্মদপুর এলাকায় খুনখারাবি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। দ্রুত কঠোর অভিযান চালানো না হলে এলাকাটি আবারো সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে। তাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দৃশ্যমান টহল, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। গত এক মাসে মোহাম্মপুরে চারটি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো: ইবনে মিজান জানান, পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো- এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। বসিলা এলাকাটি মোহাম্মদপুর থানা (পুলিশ স্টেশন) থেকে তুলনামূলক দূরে হওয়ায় আগে থেকেই এখানে অপরাধীদের তৎপরতা বেশি ছিল। অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পটি স্থাপন করা হয়েছে। ক্যাম্প স্থাপনের পর নিয়মিত টহল ও চেকপোস্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এখানে ছিনতাই, মাদককারবার, মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। এখন স্থানীয় মানুষ দ্রুত পুলিশি সহায়তা পাবে, যেকোনো অভিযোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে ক্যাম্পে যোগাযোগ করলে পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবে। ভবিষ্যতে এই ক্যাম্প অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।