নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
৩৯১ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা: সেলিনা হায়াৎ আইভী। কারামুক্তির পর আইভীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা সমীকরণ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হাল ধরার বিষয়ে আলোচনায় রয়েছেন তিনি। তবে জামিন পাওয়ার পর বুধবার মধ্যরাতে বাড়িতে ফিরে বিএনপি সরকারের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। এদিকে আইভীর কার্যক্রম তদারকির জন্য বাড়ির আশপাশে বসানো হয়েছে শক্তিশালী সিসি ক্যামেরা।
বুধবার রাত ১০টার পর কাশিম কারাগার থেকে মুক্তির পর রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাড়িতে ফেরেন আইভী। পরে এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে আইভী বলেন, আমি চাই সবাইকে নিয়ে মানবিক সরকার গঠিত হোক। জেলে আমার মতো আরো অনেক মায়েরা আছেন, তারা নিরপরাধ। আশা করি, সরকার তাদের প্রতিও সদয় হবে। একইসাথে তিনি বিচার বিভাগের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান।
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে সরাসরি চলে যান নারায়ণগঞ্জ নগরীর মাসদাইরে কেন্দ্রীয় সিটি কবরস্থানে। সেখানে বাবা, মা ও ছোটভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন।
এদিকে বুধবার রাতেই চুনকা কুটিরের সামনে ও আশপাশের কয়েকটি স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে পুলিশ। আইভীর পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রশাসনিক চাপ ও নিরাপত্তার কারণে বাড়িতে আসা লোকজনের সংখ্যা সীমিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এরপরও বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মী ও শুভাকাক্সীরা আইভীর খোঁজখবর নিতে আসছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, আইভীর বাসভবনের সামনে ও আশপাশের কয়েকটি স্থানে পুলিশ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে এসব ক্যামেরা বসানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান বলেন, ‘এটি আমাদের নিজস্ব বিষয়।’ কেন লাগানো হয়েছে, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিরাপত্তাসহ সার্বিক কারণে লাগানো হয়েছে। নজরদারির বিষয়টিও স্বীকার করেন তিনি।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে তার বাড়িতে ফিরেছেন। যেহেতু তিনি একজন সাবেক মেয়র তার নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা বিবেচনা করছি। তা ছাড়া, উনি নিজে নিষিদ্ধ সংগঠনের (আওয়ামী লীগ) কোনো কার্যক্রমে যাতে জড়িয়ে না পড়েন কিংবা তার পক্ষে কেউ যাতে উসকে না দেয় সেটিও আমাদের নজরদারিতে আছে।’
এ জন্য সাদা পোশাকে ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আইভী জামিনে থাকাবস্থায় তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারবেন কিন্তু নিষিদ্ধ সংগঠনের ব্যানারে কোনো দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।
সেক্ষেত্রে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। সার্বিক বিষয়েই আমাদের নজরদারি থাকবে। তার বাড়িকে কেন্দ্র করেই করেছি ব্যাপারটা এমন নয়। নারায়ণগঞ্জকে অপরাধমুক্ত করতে অলিগলিতে সিসি ক্যামেরার আওতায়ভুক্ত করার প্ল্যান আমাদের আছে। পুরো নারায়ণগঞ্জে দুই হাজার ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।
সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি। ২০২৫ সালের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ের ৩টি হত্যা মামলা, ২টি হত্যাচেষ্টা মামলাসহ মোট ১২টি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুই হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান সেলিনা হায়াৎ আইভী। এরপর তার মুক্তির পথ খোলে। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ছিলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। পরে নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের একটানা তিনটি নিবার্চনে জয়ী হন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ১৮ আগস্ট দেশের সব সিটি করপোরেশনের মেয়রের সাথে আইভীকেও দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।



