ক্রীড়া প্রতিবেদক
সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের আজ সেমিফাইনাল। ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে প্রথম ম্যাচে বিকেল ৪.৩০ মিনিটে নেপালের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় সেমিতে স্বাগতিক ভারতের প্রতিপক্ষ ভুটান। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে গত দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। দুইবারই ফাইনালে নেপালকে হারিয়ে ট্রফি জয় করে সাবিনার নেতৃত্বাধীন দল। এবার হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন মিশনের স্কোয়াডে নেই এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড। এবার সাফে গ্রুপ পর্বে স্বাগতিক ভারতের কাছে হেরে গ্রুপ রানার্সআপ হয় পিটার বাটলার বাহিনী। ফলে গ্রুপ ‘এ’র চ্যাম্পিয়ন নেপালকে শেষ চারের লড়াইয়ে পেল বাংলাদেশ।
ভারতের গোয়ায় জওয়াহেরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে আজ শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নেপালের বিপক্ষে বিকেল ৪টায় মাঠে নামবে বাংলাদেশ। এর আগে গতকাল মাঠের লড়াই শুরুর আগেই একরাশ বিষাদ ছুঁয়ে গেল বাংলাদেশ শিবিরকে। নিজেদের রণকৌশল ঝালিয়ে নিতে সকাল ৭টায় গোয়ার বামবোলিম অ্যাথলেটিক গ্রাউন্ডে অনুশীলনের সূচিও ছিল দলের। সকাল সাড়ে ৬টায় হাজির হয়েছিলেন সাংবাদিকেরাও। কিন্তু তার আগেই ভোর ৫টায় বাংলাদেশ শিবিরে এসে পৌঁছেছে এক দুঃসংবাদ। কিডনি জটিলতায় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে মারা গেছেন গত দুইবারের সাফজয়ী সেন্টারব্যাক শিউলি আজিমের মা বাসনা আজিম। এই আকস্মিক মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো দল। তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয় মাঠের অনুশীলন।
শিউলির আত্মীয় বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা। দু’জনের কান্না ছুঁয়ে যায় দলের অন্যদেরও। ওই অনুশীলন তাই বাতিল হয়ে যায়। মাঠে কৌশলগত অনুশীলন করা না গেলেও বসে থাকেননি কোচ বাটলার। ভিডিও সেশনে ছক বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে নেপাল ম্যাচের প্রস্তুতিও তো নিতে হবে। এক দিকে মা হারানোর শোক, অন্য দিকে দেশের প্রয়োজন, শেষ পর্যন্ত শোক সয়ে বাংলাদেশের ডাকেই সাড়া দিলেন। বেলা ৪টায় দল নিয়ে নেমে পড়লেন সমুদ্র সৈকতে। টিম হোটেলের পাশে আরব সাগরের তীরে সতীর্থদের সাথে অনুশীলনে নেমে পড়লেন শিউলিও।
সকালের কান্নাকাটির পর শিউলি অনেকটাই নিজেকে সামলে নিয়েছেন। দলের সবচেয়ে বয়সী খেলোয়াড় তিনি, অভিজ্ঞতাও এগিয়ে। তার ভেঙে পড়া যেন অন্যদের ওপর প্রভাব না ফেলে, তাই ভেতরে কষ্ট তিনি চেপে রাখার চেষ্টা করছেন। কোচিং স্টাফের এক সদস্য মতে, ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে শিউলিকে খেলানোর পরিকল্পনা আছে তাদের। ২৪ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডারও শোককে শক্তিতে রূপ দিতেই রয়ে গেছেন দলের সাথে।
নেপালের বিপক্ষে সেমিফাইনালে নামার আগে পরিসংখ্যান অবশ্য বাংলাদেশের বিপক্ষে। সাফের সেমিফাইনালে নেপালকে কখনই হারাতে পারেনি গত দুই আসরের চ্যাম্পিয়নরা। প্রথম সাফে সেমিতে ২০১০ সালে ০-৩ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। এরপর ২০১৪ সালেও নেপালের কাছে হার ০-১ গোলে। ২০১৯ সালে গ্রুপ পর্বে ০-৩ গোলে হারতে হয়েছিল নেপালিদের কাছে। এবার কি শোককে শক্তিতে পরিণত করে আগের সেই হারের বদলা নিয়ে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে এগিয়ে যেতে পারবে বাংলাদেশ নারী দল।
নেপালকে নিয়ে উদ্বিগ্ন নন বাটলার
গত দুই সাফে বাংলাদেশ ভারতের পাশাপাশি নেপালকেও হারিয়েছিল। তবে এবার গোয়া সাফে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের যে হতশ্রী চেহারা দেখা গেছে ভারতের বিপক্ষে তাতে আজ নেপালের বিপক্ষে সেমিতে মারিয়া মান্ডাদের জয় নিয়ে সংশয়ের জন্ম দিচ্ছে। তার উপর গতকাল সকালে বাংলাদেশ দলের উইথ বল অনুশীলন বাতিল করা হয়েছে নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার শিউলী আজিমের মায়ের মৃত্যুর কারনে। যা দলের জন্য একটি বড় ধাক্কা। বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলারের মতো নেপালের কোচ নবীন নিউপানেও শোক জানিয়েছেন শিউলী আজিমের মায়ের মৃত্যুতে। তবে এই মৃত্যু আজ বাংলাদেশ দলের জয়ের পথে কোনো বাধাই হবে না। এমনটাই জানিয়েছেন কোচ বাটলার। উল্টো দৃঢ়তার সাথেই এই ব্রিটিশ কোচ জানান, ‘নেপাল নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। তাদের বিপক্ষে সিনিয়র সাফে জিতেছি। অনূর্ধ্ব-২০, অনূর্ধ্ব-১৯ সাফেও জয় পেয়েছি। তাই সেমিতেও তাদের বিপক্ষে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী আমি।’
বাংলাদেশ কোচ অতি আক্রমণাত্মক কৌশলে হাই লাইন ডিফেন্সে খেলান দলকে। আজও নেপালকে হারাতে আক্রমণাত্মক কৌশলে খেলবে লাল-সবুজ নারীরা। বাটলারের মতে, আমরা এই ম্যাচে আক্রমণাত্মক কৌশলেই খেলব। তাদেরকে হারানোর ব্যাপারে দৃঢ় প্রতীক্ষ। ভালো ম্যাচ দিয়েই জিতে যেতে চাই ফাইনালে।’
গত দুই সাফেই বাংলাদেশ ফাইনালে নেপালকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল। নিজ মাঠে প্রথম সিনিয়র নারী সাফের শিরোপা জিততে না পারার কষ্ট তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে নেপালী মেয়েদের। তাই বলে প্রতিশোধ শব্দ মনের মধ্যে গেঁথে খেলতে নামবে না হিমালয়ের কন্যারা। কোচ নবীন নিউপানের মতে, ‘আমরা বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রতিশোধ মিশনে নামব তা নয়। আমরা আমাদের স্বাভাবিক ম্যাচ খেলেই বাংলাদেশকে হারাতে চাই। ম্যাচটি দুই দলের জন্যই ফিফটি ফিফটি। যারা সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে তারাই জিতবে।’ এরপর যোগ করেন, ‘ভারতের সাথে গত ম্যাচে বাংলাদেশ হেরেছে। তখন দিনটি আসলে বাংলাদেশের ভালো যায়নি। তারা যথেস্ট শক্তিশালী দল। তাদের মূল শক্তি তারা ফাইটিং দল। এশিয়ান কাপে খেলার অভিজ্ঞতা পুষ্ট।’
বাংলাদেশ দল ভুগছে ডিফেন্সিভ দুর্বলতায়। মালদ্বীপ ও ভারতের বিপক্ষে এই রক্ষনকর্মীরাই তিনটি গোলের জন্য দায়ী। তার উপর ডিফেন্ডার শিউলী আজিম মাতৃশোকে কাতর। আফঈদা খন্দকার প্রান্তি এবং সুরমা জান্নাতদের বিকল্প হিসেবে যদি শিউলীকে আজ খেলানো হয় তাহলে তার পক্ষে কি এক দিনের ব্যবধানে শোককে শক্তিকে পরিণত করা সম্ভব?



