ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
২০২৪ সালের ২৪ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে টানা কয়েক দিনের সঙ্ঘাত, কারফিউ ও অচলাবস্থার মধ্যে দেশজুড়ে নিরাপত্তা অভিযান আরো জোরদার হয়। পঞ্চম দিনের মতো কারফিউ বহাল থাকলেও কয়েক ঘণ্টার জন্য তা শিথিল করা হয়। একই দিনে সীমিত পরিসরে পাঁচ দিন পর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়, যদিও মোবাইল ইন্টারনেট তখনো বন্ধ ছিল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ দিন রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপক চিরুনি অভিযান চালায়। বিভিন্ন জেলা থেকে আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ প্রায় এক হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় গ্রেফতার হন ৬৪১ জন। ১৭ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত আট দিনে সারা দেশে গ্রেফতারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজারে পৌঁছে। তৎকালীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, ভিডিওফুটেজ বিশ্লেষণ করে সহিংসতার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
দিনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আবার চালু হওয়া। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তত্ত্বাবধানে রাতে পরীক্ষামূলকভাবে ব্রডব্যান্ড সংযোগ চালু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ব্যাংক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, রফতানিমুখী শিল্প, আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। সরকার জানায়, পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে অন্যান্য সেবাও চালু করা হবে। তবে মোবাইল ইন্টারনেট তখনো বন্ধ রাখা হয়।
এ দিন সহিংসতায় আহত আরো চারজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং একজন সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বিভিন্ন হাসপাতাল, স্বজন ও গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ২৪ জুলাই পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা অন্তত ২০১ জনে পৌঁছায়। নিহতদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত না হওয়া আটজনের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। এ ঘটনা আন্দোলনকে ঘিরে মানবিক সঙ্কটের আরেকটি বেদনাদায়ক দিক হিসেবে আলোচনায় আসে।
কারফিউ কয়েক ঘণ্টার জন্য শিথিল হওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সীমিত পরিসরে জনজীবন সচল হতে শুরু করে। সরকারি অফিস ও ব্যাংক চার ঘণ্টার জন্য খোলা হয়। দূরপাল্লার বাস চলাচল শুরু করে এবং সদরঘাট থেকে লঞ্চ বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায়। কিছু শিল্পকারখানা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হলেও রাজধানীতে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর যৌথ টহল অব্যাহত ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেল ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তখনো চালু হয়নি।
এ দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদের সন্ধান পাওয়া যায়। কয়েক দিন নিখোঁজ থাকার পর আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, তাদের চোখ বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাত স্থানে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি আন্দোলন ঘিরে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করে।
সরকারের উদ্যোগে বিদেশী কূটনীতিকদের রাজধানীর ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। প্রায় ৪৯টি কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, যার মধ্যে ২৩ জন রাষ্ট্রদূত ছিলেন, মেট্রোরেলের ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশন, সড়ক ভবন, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবন পরিদর্শন করেন। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরতেই এই পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে।
কোটা আন্দোলনে ১৬ জুলাইয়ের প্রাণহানির ঘটনা তদন্তে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনও এ দিন প্রথম বৈঠক করে। কমিশন গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তথ্য আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরিকল্পনার কথা জানায়। একই সময়ে তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, সহিংসতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, জনমনে স্বস্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত কারফিউ বহাল থাকবে।
এ দিকে নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই নারী জঙ্গি ইশরাত জাহান মৌসুমী ও খাদিজা পারভীন মেঘলাকে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট গ্রেফতার করে। একই সাথে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ২৯২ জন বন্দী আত্মসমর্পণ করেন বলে জানানো হয়। এ দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ অবিলম্বে ইন্টারনেট চালু, কারফিউ প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবি জানিয়ে আলটিমেটাম দেয়। অপর একটি অংশ ২৫ জুলাই দেশব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন জানায়, তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানায়। একই সময়ে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং সরকার যত দিন প্রয়োজন মনে করবে, তত দিন সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করবে।
শিক্ষা কার্যক্রমও সঙ্কটের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪৪তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষাসহ সব ধরনের পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে।
২৪ জুলাই ছিল এমন একটি দিন, যখন এক দিকে দেশজুড়ে চলেছে গণগ্রেফতার, চিরুনি অভিযান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার; অন্য দিকে সীমিতভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালুর মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। তবে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকা, প্রাণহানি, ব্যাপক গ্রেফতার ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই ছিল।



