এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব পাওয়া শিক্ষকদের অনেকেই সময়মতো পারিশ্রমিকের টাকা পাচ্ছেন না। ফলে উত্তরপত্র নিতে বোর্ডে আসতে চান না তারা। অনেকটা বাধ্য হয়েই কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির ভয়ে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব নিলেও শিক্ষকদের রয়েছেন নানা অভিযোগ।
তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে শিক্ষা বোর্ডের অভ্যন্তরীণ নানা অনিয়মের কথা। আর এসব অভিযোগের বিষয়ে কমবেশি সবাই জানেন। শিক্ষকদের অনেক অভিযোগের মধ্যে একটি গুরুতর অভিযোগ হলো তাদের পারিশ্রমিকের টাকা ব্যাংকে লগ্নি করে মুনাফা বাড়াচ্ছে শিক্ষা বোর্ড; কিন্তু সময়মতো বোর্ড থেকে শিক্ষকদের পাপ্য সম্মানীটুকুও দেয়া হয় না। এমনও উদাহরণ আছে এক বছরের উত্তরপত্র মূল্যায়নের পারিশ্রমিক দুই-তিন বছরও পার হয়ে গেছে হাতে পেতে। ফলে এবার অনেক শিক্ষক ইচ্ছা করেই সময়মতো বোর্ডে এসে উত্তরপত্র সংগ্রহ করেননি। গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর বকশিবাজারে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড তথা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সরেজমিন দেখা গেছে নির্ধারিত টাইমলাইন পার হওয়ার পরে অনেকে শিক্ষকই বিভিন্ন জেলা থেকে এসে বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষার উত্তরপত্র সংগ্রহ করছেন।
শিক্ষা বোর্ডের কম্পাউন্ডের একটি ভবনের নির্দিষ্ট কক্ষ থেকে তালিকা দেখে প্রত্যেক শিক্ষককে তিন শ উত্তরপত্রের এক-একটি বস্তা বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর ২০-২৫ কেজি ওজনের এই উত্তরপত্রের বস্তা প্রধান ফটকের বাইরে আনতে বহিরাগত লেবারের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে শিক্ষকদের। প্রত্যেক বস্তার জন্য এক শ কিংবা দুই শ টাকা দিতে হচ্ছে। এই টাকাও শিক্ষকরা নিজের পকেট থেকেই দিচ্ছেন। এর মধ্যে যারা নারী শিক্ষকদের বস্তা গাড়িতে কিংবা রিকশায় উঠাতে আবার অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।
গতকাল দুপুরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ভেতরেই কিশোরগঞ্জ ও শরিয়তপুর থেকে আসা দুই শিক্ষকের সাথে কথা হয়। এই প্রতিবেদক তারা জানান, বুধবার বিকেলে এসেছেন ঢাকায়; কিন্তু অফিস টাইম শেষ হয়ে যাওয়ায় ওই দিন তারা উত্তরপত্র সংগ্রহ করতে পারেননি। ফলে বাধ্য হয়েই ঢাকায় একরাত অবস্থান করে গতকাল সকালে আবারো এসেছেন উত্তরপত্র সংগ্রহ করতে। এটা তাদের জন্য বাড়তি ভোগান্তি হয়েছে। তাদের মতে, পরীক্ষার এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের সাথে সম্পৃক্ত বিভাগকে অবশ্যই রাত-দিন অফিসের কাজে নিয়োজিত রাখা দরকার। এতে যেকোনো সময়ে যেকোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে। শিক্ষকদের বাড়তি ভোগান্তিও কমবে।
উত্তরপত্র নিতে আসা কয়েকজন শিক্ষক এই প্রতিবেদককে জানান, প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম ফিলাম বাবদ শত কোটি টাকার বেশি শিক্ষা বোর্ডের তহবিলে জমা হয়। আর এই তহবিল থেকেই পরীক্ষার পরিচালনার সব খরচ চালানো হয়। তবে এই খরচের মধ্যে অন্যতম একটি খাত হলো উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষকদের সম্মানী বা পারিশ্রমিক; কিন্তু দেখা যায় এসএসসি পরীক্ষার তিন মাস আগেই শিক্ষা বোর্ডের একাউন্টে ফরম ফিলামের সব টাকা জমা হয়। এই টাকা তারা (শিক্ষা বোর্ড) ব্যাংকে এবং একাউন্টে লগ্নি করে মুনাফার অঙ্ক বাড়ায়। অন্য দিকে উত্তরপত্র মূল্যায়নের অর্থ বছর পার হলেও শিক্ষকরা হাতে পান না।
একটি পাবলিক পরীক্ষা উপলক্ষে শিক্ষা বোর্ডের ফান্ডে জমা হয় সাড়ে চার শ’ কোটি টাকার বেশি। যেমন এ বছর এসএসসিতে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে গড়ে দুই হাজার থেকে দুই হাজার দুই শ টাকা জমা দিয়ে ফরম ফিলাম করতে হয়েছে। এই টাকা পরীক্ষার শুরুর আগে সেভাবে খরচ হয় না। ফলে পুরো টাকাই তারা ব্যাংকে লগ্নি করে রাখেন। এতে প্রতি মাসেই একটি বড় অঙ্কের টাকা বোর্ড মুনাফা হিসেবে পায়।
উত্তরপত্র মূল্যায়নের টাকা সঠিক সময়ে শিক্ষকরা হাতে পান না একথা স্বীকার করেছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার। তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, আগে উত্তরপত্র মূল্যায়নের টাকা পেতে বছরের বেশি অপেক্ষা করতে হতো। আমরা এখন এই সময় কমিয়ে এনেছি। যদিও এখনো কোনো কোনো শিক্ষককে পারিশ্রমিক পেতে দুই মাস তিন মাস অপেক্ষা করতে হয় । তবে চলতি বছর থেকে আমরা চেষ্টা করছি এক মাসের মধ্যেই যেন প্রত্যেক শিক্ষক তার পারিশ্রমিক হাতে পান। আর আমরা সম্মানীর অর্থও বাড়িয়েছি।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, এবার বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের পর আগামী ১১ মে বোর্ডে জমা দেয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু গতকাল ৭ মে পর্যন্ত দেখা গেছে সব উত্তরপত্র এখনো শিক্ষকরা বোর্ডে এসে নিয়ে যাননি। তবে গতকাল সন্ধ্যায় বোর্ড সূত্র জানিয়েছে বাংলা প্রথম পত্রের সব খাতা বিলি হয়ে গেছে। আগামীকাল শনিবার থেকে বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার উত্তরপত্র বিতরণ শুরু হবে।
সূত্র আরো জানায়, প্রতিটি বিষয়ের উত্তরপত্র বোর্ড থেকে বিতরণের ১৫ দিনের মধ্যে মূল্যায়ন শেষ করে পুনরায় বোর্ডে নিয়ে এসে জমা দেয়ার জন্য শিক্ষকদের প্রতি কড়া নির্দেশনা দেয়া আছে।
এদিকে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিস সূত্রে জানা গেছে এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সম্মানীও প্রতি খাতার জন্য ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে একটি উত্তরপত্রের জন্য সম্মানী ছিল ৩৫ টাকা, সেখানে এবার বাড়িয়ে ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর প্রধান পরীক্ষক বা রি-এক্সামিনারের সম্মানীও আগের তিন টাকা থেকে বাড়িয়ে চার টাকা করা হয়েছে। আগের বছরগুলোতে যেখানে একজন শিক্ষককে ৫-৬ শ উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব দেয়া হতো, এ বছর সেখানে মাত্র ৩ শ উত্তরপত্র দেয়া হচ্ছে; ফলে প্রতিটি উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন তারা। শিক্ষার্থীদের মনেও কোনো সন্দেহ বা সংশয়ও থাকবে না।



