ইউএনজিএর সভাপতি পদে জয় বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা বাড়াবে

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

সাইপ্রাসের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি পদের নির্বাচনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের বিজয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা বাড়াবে। ইউএনজিএর সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে বাংলাদেশকে স্বল্প সময়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দ্বিপক্ষীয় বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো ইস্যুতে বিদেশী রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর সাথে আলোচনায় আগের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবেন। এই বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাব, জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

গত মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে ইউএনজিএ সভাপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জাতিসঙ্ঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৯০টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। ভোটাভুটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯টি ভোট। আর সাইপ্রাসের বহুপাক্ষিকতা বিষয়ক বিশেষ দূত ও রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিস পেয়েছেন ৯১টি ভোট। অর্থাৎ আট ভোটের ব্যবধানে বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে। এই বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়ে ড. খলিলুর রহমানে প্রোফাইল আরো সমৃদ্ধ হলো এবং ব্যক্তিগতভাবে তিনি লাভবান হবেন। অন্যদিকে রাষ্ট্র হিসেবে সরাসরি লাভবান হতে না পারলেও এই বিজয় বাংলাদেশের সামনে কিছু সুযোগ সৃষ্টি করবে। আলোচনা আছে যে খলিলুর রহমান এক বছরের ছুটি নিয়ে ইউএনজিএর পূর্ণকালীন সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর তিনি দেশে ফিরে আবারো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে সক্রিয় হবেন। এ সময় ইউএনজিএর সভাপতি হিসেবে সফলতা অর্জন করতে পারলে খলিলুর রহমান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তা দেশের কাজে লাগাতে পারবেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিদেশ সফরে গেলে অথবা বাংলাদেশে বিদেশী অতিথিদের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে ইউএনজিএর সাবেক সভাপতি হিসেবে তিনি সমীহ অবস্থানে থাকবেন। অর্থাৎ তার কথার গুরুত্ব আগের চেয়ে বাড়বে। এটাকে বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পারে তার ওপর অর্জনটা নির্ভর করবে।

ইউএনজিএর সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের বিজয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি করবে উল্লেখ করে মাহফুজুর রহমান বলেন, এই নির্বাচন করতে গিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দ্বিপক্ষীয় বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো ইস্যুতে বিদেশী রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর সাথে আলোচনায় আগের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতে পারেন।

সরকার থেকে ছুটি নিয়ে ইউএনজিএর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে খলিলুর রহমানের সামনে কোনো বাধা নেই উল্লেখ করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, খলিলুর রহমান বাংলাদেশ সরকারের সাথে যোগাযোগ রেখেই ইউএনজিএর সভাপতির দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন, আর এটিই স্বাভাবিক।

গতকাল জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইউএনজিএর সভাপতি পদে ড. খলিলুর রহমানে বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাব, জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এই সাফল্য বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি মর্যাদাপূর্ণ পদে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা নয়, বরং এটি বহুপক্ষীয় কূটনীতি, শান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দেশের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এই গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক অর্জনের পিছনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সীমিত সময়ে বাংলাদেশের সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং প্রার্থী ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা- এই তিনটি বিষয় মূল ভূমিকা পালন করেছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৯৭৮ সালে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদে বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়টি স্মরণ করেন। সেই সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বে সীমিত সময়ে পরিচালিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ তৎকালীন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী জাপানকে পরাজিত করে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএনজিএর সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে দেশের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়। এরপর থেকেই পূর্ণমাত্রার কূটনৈতিক প্রচারণা শুরু হয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির সুযোগ না থাকায় এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সাথে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক ফোরামে অত্যন্ত সক্রিয় ও কৌশলগত প্রচারণা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনে সফল হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ২০১৬ সালে তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে গত এক দশক ধরে ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়েছে। বিশেষ করে গত এক বছরে দেশটি অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা করেছে। জাতিসঙ্ঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এত অল্প সময়ে সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য খুবই কঠিন ও কৌশলগতভাবে চ্যালেঞ্জিং ছিল। এই প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পাশাপাশি নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলো সমর্থন আদায়ে সমন্বিত ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশ সরকার এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের জন্য জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশসমূহের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং জাতিসঙ্ঘের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে।