নিজস্ব প্রতিবেদক
- তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান বয়কট
- জনস্বার্থবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করব : ডা: শফিকুর রহমান
- ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদে’র শপথ না নিয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বিএনপি : নাহিদ ইসলাম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য এবং একই সাথে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদে’র সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা। জামায়াতের ৬৮ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৬ জন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের একজন একই সাথে দুই শপথ গ্রহণ করেন। তাদের সাথে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নির্বাচিত একমাত্র সংসদ সদস্যও একই সাথে দুই শপথ নেন। সবমিলিয়ে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন ৭৮ জন নবনির্বাচিত এমপি। তবে সরকারি দল সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ার প্রতিবাদ হিসেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করে ১১ দলীয় জোট।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলনের এমপিরা শপথ নেন। একই সাথে শপথ নেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরাও। বিএনপির সাথে শপথ নিতে না পারা দলটির সদস্য ইশরাক হোসেনও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সাথে শপথ নেন। পরে শপথ নেন এনসিপির ছয়জন সংসদ সদস্য।
জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে এই অনুষ্ঠান হয়। জামায়াতসহ বিরোধী দলের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পৃথকভাবে এই দুই শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, উপনেতা তাহের, চিফ হুইপ নাহিদ : এ দিকে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পর সংসদীয় কমিটির বৈঠক করেন জামায়াত জোটের এমপিরা। জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। বিরোধীদলীয় উপনেতা করা হয়েছে দলটির নায়েবে আমির ও কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ করা হয়েছে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে। জামায়াতের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
জনস্বার্থবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করব-জামায়াত আমির : শপথ গ্রহণ ও সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আজকে ছিল নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের দিন। গত সোমবার গভীর রাতে আমাদের চিঠি দেয়া হয়েছিল। যেটা আমাদের জন্য কিছুটা অস্বস্তিজনক ছিল। তারপরও আমাদের নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেশবাসীর প্রতি সম্মান রেখে আমরা শপথ নিতে এসেছিলাম। আগের সংসদগুলোতে লক্ষ্য করেছি একই দিনে একই সাথে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। এবারই মনে হয় আপনারা ব্যতিক্রম লক্ষ্য করেছেন। সরকারি দল আমাদের আগে শপথ নিয়েছেন। সংসদ সচিবালয় থেকে যে চিঠি দেয়া হয়েছিল সেখানে দুইটি শপথের কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল সংসদ সদস্য হিসেবে আমরা শপথ নেবো। আরেকটি শপথ হলো জুলাই সনদ ও গণভোটের যে প্রজ্ঞাপন হয়েছিল, সংস্কারের শপথ। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আরেকটি শপথ আমরা নেবো। সংসদ সচিবালয় থেকে বলা হলো যে সকালে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা শুধু এমপি হিসেবে শপথ হিয়েছেন, আপনারা কী করবেন? বলেছি যে,আমরা দু’টিরই শপথ নিতে এসেছি।
জামায়াত আমির বলেন, ২০২৬ সালে কোনো নির্বাচন হওয়ারই কথা ছিল না। এই নির্বাচন হয়েছে ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের কারণে। যাদের কারণে আজকের এই সংসদ, গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাদের স্মরণ করছি। যারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন আল্লাহ তাদের শহীদ হিসেবে কবুল করুন। যারা লড়াই করে আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, তাদের প্রতি সমবেদনা।
আজকে আমরা শপথ নিতে হয়তো ভিন্ন চিন্তা করতে পারতাম। কারণ জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা ও গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান দেখানোকে পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে মনে করছি। আমরা জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা ও গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়েছি। যারা ভোট দিয়েছেন তাদেরকে সম্মান জানিয়েছি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা মনে করি, সরকারি দল শপথ (সংবিধান সংস্কার পরিষদ) না নিয়ে জুলাইকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করেছে। এতে জনআকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান বলে মনে করি। সংস্কারের বিপক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ার বিষয়ে তারা ব্যাখ্যায় বলেছে যে, সংসদ বসার পর প্রভিশন ক্রিয়েট করে এটা তারা দেখবেন। আমরা এটা দ্রুত দেখতে চাই। যদি তারা জুলাইকে সম্মান করেন, যদি সংস্কারকে ধারণ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও প্রচারণার সময় জনগণকে বলেছেন যে, আপনারা গণভোটে হ্যাঁ বলুন। যদি এর প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল হন, তাহলে আমরা মনে করি তারা ওই শপথ (সংবিধান সংস্কার পরিষদ) নেবেন। কার কাছে শপথ নেবেন, সেটা আমরা বলব না। তাদের পছন্দ মতো যে কারো কাছে শপথ নিতে পারেন, আমাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু আমরা দেখতে চাই জুলাই সম্মানিত হয়েছে এবং স্বীকৃত হয়েছে। জুলাইকে অসম্মান ও অশ্রদ্ধা করে স্বীকৃতি না দিয়ে ২৬-এর এই পার্লামেন্ট নিশ্চয় গৌরবের আসনে বসতে পারবে না। আমরা আশা করেছিলাম, তারাও দুটো শপথ নেবেন, আমরাও নেব। অথরিটির পক্ষ থেকে বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথের অনুষ্ঠানের দাওয়াত করেছিল আমাদের অংশগ্রহণ করার জন্য। আমাদের মানসিক প্রস্তুতিও ছিল। কিন্তু আমরা এসে (সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য শপথ না নেয়ায়) ধাক্কা খেয়েছি। আমরা আমাদের জুলাই শহীদদের অশ্রদ্ধা করতে পারি না। জুলাইযোদ্ধাদেরও আমরা অশ্রদ্ধা করতে পারি না। যার কারণে আমাদের শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিকেলের এই শপথ অনুষ্ঠানে আমরা যোগ দিতে পারলাম না, আমাদের আফসোসের জায়গা থেকে গেল। আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে যেতে পারতাম যদি তারা আমাদের মতো দুটোতেই শপথ নিতেন। তাহলে আমাদের কোনো ধরনের আপত্তির জায়গা থাকত না। আজকে আমরা যারা শপথ নিয়েছি, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলেছিলাম, আমাদের কেউ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে বা সরকার গঠন করলে কেউই সরকারি প্লটের সুবিধা নেবো না এবং ট্যাক্সবিহীন গাড়িতেও চড়ব না। আমরা আজকেও এটা পুনর্ব্যক্ত করছি। আমাদের এই সিদ্ধান্তে আমরা অবিচল ও অটল। এই সুবিধা আমরা নেবো না। এ ছাড়া বাকি আরো কোনো সুবিধা না নেয়া যায় সেটাও আমরা দেখব।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সরকারি দল হতে পারিনি এটাতে আফসোস নেই। আমাদের আফসোসের জায়গা হলো পরপর তিনটি নির্বাচন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে জাতি বড় আশা করেছিল যেভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে তারা ভোট দিয়েছেন, তাদের ভোটের প্রতিফলনটা যখন ফলাফল প্রকাশ হবে। কিন্তু সেখানে অনেক কিছু ঘটেছে, সেটা অন্য সময় বলব। জাতির এই উৎসব ফল প্রকাশের পর পর উবে গেছে। তারপরও আমাদের পক্ষ থেকে বলতে চাই আমরা দেশকে ভালোবাসি। দেশ এবং জনগণের ভালোর জন্য সরকারও যদি কোনো উদ্যোগ নেয় আমাদের সমর্থন পাবে। কিন্তু দেশ ও জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কোনো কিছু যদি দেখি তাহলে আমরা জনগণের হয়ে এই জনস্বার্থবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলব, ইনশা আল্লাহ সেটা জনগণকে সাথে নিয়ে।
১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যভুক্ত দলগুলোকে ভোট দেয়া বা সমর্থনের কারণে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার ওপর ব্যাপক হামলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, সরকারি দলের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে ১১ দলীয় ঐক্য। এখনই এসব হামলা বন্ধ হওয়া উচিত। সরকারকে এ ব্যাপারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। আর যদি কোনো পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তাহলে ১১ দল জনগণের পাশে দাঁড়াবে। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না।
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রী করা ফেয়ার নয় : সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে মন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) করার বিষয়ে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, এটা তো সরকারি দল তাদের চয়েজের মানুষ নিয়েছে। তবে আমরা এটাকে ফেয়ার মনে করি না। যারা ইন্টারিম গভর্নমেন্টের পার্ট ছিলেন, তারা আবার একটা রাজনৈতিক গভর্নমেন্টের অংশ হবেন। তাহলে তারা কতটা নিরপেক্ষ ছিলেন এবং ছিলেন না সেই জায়গায় প্রশ্ন উঠতেই পারে।
তিনি বলেন, আমরা এই শপথ না নিলেও পারতাম, কারণ অনেক কিছুই হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু আমরা চাই, ক্রমান¦য়ে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করুক। এই রূপে আসতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নাই। এই জন্য আমরা শত কষ্ট থাকা সত্ত্বেও সংসদে অংশগ্রহণ করছি। দোয়া করবেন, যাতে দেশ ও জাতির পক্ষে ভূমিকা রাখতে পারি। দেশের ভেতর যাতে প্রত্যেক মানুষ নিরাপত্তা ভোগ করে, কর্মসংস্থান যাতে আসে। মর্যাদাশীল একটা দেশ হিসেবে নিজেরটা নিজেই গড়ে তুলতে পারি।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বিএনপি : এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারি দল যে আজ ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিলো না, এটা গণভোটের যে গণরায় এসেছে, ‘হ্যা’-এর পক্ষে- সেই রায়ের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখানো হয়েছে। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছে। সরকার গঠনের প্রথম দিনই যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল, তাদের কাছ থেকে এই দেশ, জাতি এবং আমরা কী আশা করব? সেটা সবার মনেই প্রশ্ন তৈরি করেছে। এটা শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নয়, আইনি সঙ্কট ও জটিলতা তৈরি করছে। গণভোট যে আদেশের ভিত্তিতে হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ- সেই আদেশে সুস্পষ্ট লেখা আছে, জনগণের সার্বভৌম যে অভিপ্রায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল যার ভিত্তিতে সংস্কারের আকাক্সক্ষা সেই অনুযায়ী গণভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় আসলে শপথ হবে একই অনুষ্ঠানে, একই ব্যক্তি শপথ পড়াবেন। আজকে শপথ নেয়ার বিষয়ে যে ব্যাখ্যা তারা দিচ্ছেন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। তারা বলছেন গণভোট সংবিধানে নাই। গণভোট বিষয়টাই তো সংবিধানে ছিল না, গণভোটের বৈধতা হচ্ছে সেই আদেশ। সেই আদেশ সবাই মেনেই আমরা এই নির্বাচনে (গণভোট) অংশগ্রহণ করেছি। ফলে এখানে একটি আইনি ও সাংবিধানিক সঙ্কটও তৈরি হলো। আমরা জানি না এটা কিভাবে নিরসন হবে। আমরা আহ্বান করব তারা যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেব শপথ পাঠ করে এই সঙ্কটের নিরসন করবেন এবং জনগণের প্রতি আমাদের সবার যে প্রতিশ্রুতি ছিল সংস্কারের বিষয়ে, সেই প্রতিশ্রুতির পক্ষে কাজ করব।



