জসিম উদ্দিন রানা
বিসিবির পরিবর্তনটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি সময়ের অবসানও। কারণ, বুলবুল শেষ পর্যন্ত নিজেকে সরিয়ে নিতে চাননি। চাপ, সমালোচনা, এমনকি একাকিত্ব-সবকিছুর মধ্যেও তিনি দায়িত্বে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। বুলবুলের সময়কে যদি ভিন্নভাবে দেখা যায়, তা হলে এটি ছিল এক ধরনের অসহযোগিতা। যেখানে একজন উন্নয়নকেন্দ্রিক, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রশাসক এসে পড়েন একটি জটিল, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কাঠামোর ভেতরে। তার চিন্তা ও বাস্তবতার মধ্যে ফাঁকটাই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কোন রাজনৈতিক দলের নয় বিধায় কোন ধরণের সহযোগিতা পাননি সদ্য বিদায়ী এ প্রেসিডেন্ট।
বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের আগমনটা ছিল অনেকটা অপ্রচলিত পথ ধরে। কোচিং বা সরাসরি বোর্ড রাজনীতির ভেতর দিয়ে নয়, বরং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ভা-ার নিয়ে তিনি উঠে এসেছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সর্বোচ্চ পদে। সে কারণেই তার দায়িত্ব গ্রহণকে ঘিরে ছিল কৌতূহল, সঙ্গে এক ধরনের সতর্ক আশাবাদ!
দায়িত্ব নেয়ার শুরুতেই তিনি ছিলেন তুলনামূলক নীরব, পর্যবেক্ষণধর্মী। বোর্ডের ভেতরের জটিলতা বোঝার চেষ্টা করছিলেন-এমনটাই মনে করেছিলেন অনেকে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, বিসিবি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি সম্পর্ক, প্রভাব আর ক্ষমতার সূক্ষ্ম ভারসাম্যের জায়গা। আর সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই হয়ে ওঠে তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বুলবুলের সময়ের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল- তিনি দৃশ্যমান উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা বলতেন, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বারবার আটকে যেতেন। বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামকে ঘিরে তার ‘মাস্টারপ্ল্যান’ আলোচনায় এলেও সেটি এগোয়নি প্রত্যাশিত গতিতে। একই সময়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে স্থবিরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে, যা তার প্রশাসনিক দক্ষতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
বোর্ডের ভেতরে তখন অন্য এক গল্প চলছে। ধীরে ধীরে কমতে থাকে তার আশপাশের সমর্থন। একে একে পরিচালকদের পদত্যাগ যেন একটি বার্তা দিতে থাকে- নেতৃত্বের ভেতরে কোথাও সমস্যা রয়েছে। যে বোর্ড নিয়ে কাজ করার কথা ছিল দলগতভাবে, সেটি ক্রমেই হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। বিশেষ করে টি-২০ বিশ্বকাপ বর্জন আর ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে সমস্যা তাকে অনেকটাই কোণঠাসা করে ফেলে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে নির্বাচন-সংক্রান্ত বিতর্ক থেকে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের নির্বাচন নিয়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক প্রশ্নই তোলে না, বরং পুরো বোর্ডের বৈধতা নিয়েই সন্দেহ তৈরি করে। বিষয়টি তদন্তে নেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে ভেঙে দেয় বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড। একই সঙ্গে গঠন করা হয় নতুন অ্যাডহক কমিটি, যার নেতৃত্বে আনা হয় তামিম ইকবালকে।
এনএসসির সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক (উপ-সচিব) মোহাম্মদ আমিনুল এহসান জানান, এনএসসি নীতিমালা ২০১৮-এর ২১ ধারা অনুযায়ী আমিনুলের কমিটি ভেঙে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তটি বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সস্থা আইসিসিকেও জানানো হয়েছে।
কোন আইনে ভাঙলো বোর্ড
বাংলাদেশ ক্রিকেটে বড় এক প্রশাসনিক পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন- কোন ক্ষমতা বলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) ভেঙে দিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচিত কমিটি? নির্বাচিত বোর্ড, গঠনতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন- সব কিছুর ওপরে চলে গেল একটি আইনি ধারা। বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্তটি যতটা না হঠাৎ, তার চেয়ে বেশি ছিল আইনি কাঠামোর একটি প্রয়োগ-এমনটাই বলছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। এনএসসি তাদের সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন ২০১৮’-এর ধারা ২১।
এই ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো ক্রীড়া সংস্থার নির্বাহী কমিটি যদি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয় বা সংস্থার স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকে বলে পরিষদের কাছে প্রতীয়মান হয়, তাহলে সেই কমিটি ভেঙে দেয়ার ক্ষমতা এনএসসির রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে নতুন করে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠনের এখতিয়ারও তাদের দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিসিবির গঠনতন্ত্রের ৯.৩.৩ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগটি ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। এই ধারায় বলা আছে, বোর্ড ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারকে কাউন্সিলর হিসেবে মনোনীত করতে পারবে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, বুলবুল এককভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা তার একক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে বলে মনে করছে এনএসসি। তাদের ভাষায়, এটি ছিল ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।
এনএসসি আশাবাদী, তাদের এই সিদ্ধান্ত আইসিসি গ্রহণ করবে। কারণ হিসেবে তারা তুলে ধরছে- স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ক্রিকেট প্রশাসনকে সুশৃঙ্খল করা।
তামিমসহ ওরা ১১ জন
আজ থেকে বুলবুলের চেয়ার তামিম ইকবালের হয়ে গেল। তামিমকে প্রধান করে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটিতে তামিমসহ সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ, ইসরাফিল খসরু, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, সালমান ইস্পাহানি এই পাঁচজন চট্টগ্রামের স্থানীয়। মির্জা ইয়াসির আব্বাস, সৈয়দ ইব্রাহিম আহমদ এবং ইসরাফিল খসরু তিনজন মন্ত্রীর সন্তান।
সভাপতি তামিম ইকবাল : বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে ১৫ হাজারের বেশি রান করেছেন। গত নির্বাচনে সভাপতি প্রার্থী হয়ে পরে উইথড্র করেছেন।
রাশনা ইমাম : প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী ও আইনজীবী। মির্জা ইয়াসির আব্বাস : ঢাকা-৮ আসনের এমপি মির্জা আব্বাসের ছেলে। সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে। ইসরাফিল খসরু : অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে। মিনহাজুল আবেদনী নান্নু : জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বিসিবির সাবেক প্রধান নির্বাচক। আতহার আলী খান : জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার ও ধারাভাষ্যকার। তানজিল চৌধুরী : বিসিবির সাবেক পরিচালক ও বর্তমানে প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান।
সালমান ইস্পাহানি : ইস্পাহানি গ্রুপের চেয়ারম্যান।
রফিকুল ইসলাম বাবু : সাবেক বিসিবি পরিচালক।
ফাহিম সিনহা : সাবেক পরিচালক।



