সিলেটে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, ১৫ দিনে ২ খুন

উদ্বিগ্ন খোদ পুলিশ শঙ্কিত অভিভাবক

Printed Edition

এম জে এইচ জামিল সিলেট ব্যুরো

সিলেট নগরীতে দিন দিন বেড়েই চলেছে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের পরিধি। ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, নারীদের উত্ত্যক্ত করা থেকে শুরু করে খুন-খারাবিতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এতে ১৫ দিনের ব্যবধানে খোদ সিলেট নগরীতেই খুন হয়েছে দুই কিশোর। এতে আহতের সংখ্যাও কম নয়। কিশোর গ্যাংয়ের এমন বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে শঙ্কিত অভিভাবক মহল ও উদ্বিগ্ন স্বয়ং পুলিশ।

যদিও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, তারা এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা প্রণয়ন করছে। শিগগিরই সেই তালিকা অনুসারে গ্রেফতার অভিযান চালাবে পুলিশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের শুরুতে সিলেট নগরীর পাড়া মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেয়েছিল। খুন-খারাবি নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়ে তৎকালীন মেয়র ও পুলিশের হস্তক্ষেপে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে এই কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। জানা গেছে, গত ১৫ দিনের ব্যবধানে কিশোর গ্যাং দ্বন্দ্বে সিলেট নগরীতে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রসহ দুইজন খুন হয়েছেন। এ ছাড়া খুনের রক্ত শুকাতে না শুকাতেই ফের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে আরো এক কিশোর আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

জানা গেছে, শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) বিকেল ৫ টার দিকে সিলেট নগরীর হাওয়াপাড়া গলির মুখের নয়াসড়ক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে একজন কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে। প্রথমে দুই গ্রুপের কিশোররা হঠাৎ মুখোমুখি হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। এতে একজন কিশোর রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার সঙ্গীরা দ্রুত তাকে সিএনজি অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে আহত কিশোরের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সন্ধ্যার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে সড়কের বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ দেখা গেলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। কাজিটুলা ও জেলরোড এলাকার কিশোরদের মধ্যে স্কুলকেন্দ্রিক পূর্ব শত্রুতার জেরেই এ সংঘর্ষ ঘটেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

এ ব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ শাখার (সিটিএসবি) উপ-কমিশনার তারেক আহমেদ বলেন, দুই কিশোর গ্রুপের আগের বিরোধ থেকেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে; প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথেও কথা হচ্ছে। দ্রুতই জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতেই কাজ করছে।

জানা গেছে, এর আগে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিলেট নগরীর এয়ারপোর্ট থানার বাদামবাগিচা ইলাশকান্দি এলাকায় স্থানীয় দু’টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের পূর্ব বিরোধের জেরে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে ইলাশকান্দির উদয়ন ৪০/২ এলাকার বাসিন্দা শাহ এনামুল হকের ছেলে শাহ মাহমুদ হাসান তপু (১৫) নিহত হন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে ইলাশকান্দি এলাকায় দুই কিশোর গ্যাং গ্রুপের বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপের প্রধান জাহিদ হাসান এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে তপুকে গুরুতর জখম করে। পরে গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় স্বজনরা তপুকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়। নিহতের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্থান্তর করা হয়েছে।

এ দিকে তপু খুনের ঘটনায় শুক্রবার (২৯ নভেম্বর) রাতে নিহত তপুর মা সুফিয়া বেগম বাদি হয়ে এসএমপির বিমানবন্দর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান অভিযুক্ত মো: জাহিদ হাসানসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরো চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

এসএমপির এয়ারপোর্ট থানার ওসি সৈয়দ আনিসুর রহমান জানান, মামলার এজাহারভুক্ত তিন আসামিকে ইতোমধ্যে আটক করা হয়েছে। তাদেরকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অজ্ঞাত আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসের ১০ নভেম্বর সোমবার নগরীর বালুচর এলাকায় কিশোর গ্যাং গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ফাহিম (২৩) নামে এক যুবককে কুপিয়ে আহত করে প্রতিপক্ষের লোকজন। ঘটনার রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আবারো সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে মারা যান ফাহিম।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ফাহিমের বড় ভাই মামুন আহমেদ (২৫) ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি এলাকায় ‘বুলেট মামুন গ্রুপ’ নামে একটি কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিতেন। গত ১০ অক্টোবর মামুনকে দুই সহযোগীসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ১১টি মামলা আছে। মামুন কারাগারে যাওয়ার পর ছোট ভাই ফাহিম বালুচর এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেন। এ নিয়ে একটি পক্ষের সাথে তার বিরোধ দেখা দেয়। পরে খুন হন ফাহিম।

পুলিশ তালিকা করছে, গ্রেফতার অভিযানও চালাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়, দরকার সামাজিক সচেতনতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে আড্ডা বন্ধ, অভিভাবক কাউন্সেলিং এবং পুলিশের বাড়তি তৎপরতার পরামর্শ এসেছে বিভিন্ন বৈঠক থেকে।

পুলিশ সূত্র বলছে, নগরের ছয় থানা এলাকায় কিশোর অপরাধীরা তৎপর। এদের বেশির ভাগের বয়স ১৮ বছরের নিচে। কেউ স্কুলে পড়ে, কেউ টমটম চালক। বেশির ভাগই বস্তিবাসী। এরা আগেও রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিল কখনো আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে ছবি, কখনো অন্য দলের ব্যানারে। এখনো নতুন আশ্রয়দাতার খোঁজে তারা সক্রিয়।

এ ব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে আমরাও উদ্বিগ্ন। কিছু অপরাধীর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলেও কোন রাজনৈতিক দলের শেল্টারের কোন প্রমাণ আমরা এখনো পাইনি। পুলিশ নিজেদের মতো করে দায়িত্ব পালন করছে। কিশোর অপরাধ দমনে অভিভাবক, রাজনৈতিক দলসহ সচেতন নাগরিকবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে নগরীর বেশকিছু পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডার খবর আমাদের কাছে এসেছে। আমরা একটা তালিকা প্রণয়ন করতেছি। কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশ সবসময় সক্রিয় রয়েছে।