গোলাম কিবরিয়া বরগুনা
উপকূলীয় অঞ্চলে নৌপথ ব্যবহার করে মাদক প্রবেশের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বরিশাল বিভাগভুক্ত বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও ভোলাসহ ছয় জেলায় ইয়াবা ও গাঁজার বিস্তার এখন প্রায় সর্বত্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে সেবনকারী ও খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়লেও মূল কারবারিরা থেকে যাচ্ছে অধরা- এতে জনমনে প্রশ্ন ও ক্ষোভ বাড়ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বরগুনা-ঢাকা রুটের লঞ্চগুলো মাদক পাচারের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এসব যানে যাত্রীবাহী পণ্যের আড়ালে ইয়াবার বড় বড় চালান ঢাকায় পাঠানো হয়। একই সাথে সাগরে মাছ ধরা ট্রলার ও সড়কপথও ব্যবহার করছে চক্রটি। গত মার্চে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী একটি লঞ্চে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ গাঁজা উদ্ধার করা হয়। সাম্প্রতিক আরেক অভিযানে রাজধানীর পরিচিত মাদক কারবারি মহারাজ খলিফাকে গ্রেফতার করা হলে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মাদক পাচারের পাশাপাশি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য দেন। তার সাথে আরো চারজনকে আটক করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বামনা উপজেলার তুলাতলা কাকিকাবাড়ি এলাকায় একটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের সাথে জড়িত। পরিবারের স্বামী-স্ত্রী, ছেলে ও ছেলের বৌ মিলে মাদক কারবারের সাথে জড়িত। ওই পরিবারের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। তাদের একজন সম্প্রতি যৌথবাহিনীর অভিযানে ইয়াবা, গাঁজা ও নগদ টাকাসহ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। জানা যায়, একই এলাকায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিছু ব্যক্তিও মাদক কারবারে সক্রিয়। যদিও সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগের বিষয় অস্বীকার করেছেন।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত দুই শতাধিক স্থানে প্রকাশ্যে বা গোপনে মাদক কেনাবেচা চলছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা, বামনা ও বেতাগী উপজেলায় হাটবাজার ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদক বিক্রির নানা স্পট। এই নেটওয়ার্কে কিশোর ও তরুণদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করছেন কারবারিরা। ফলে মাঠপর্যায়ে আটক হচ্ছে মূলত বাহক, সেবনকারী ও খুচরা বিক্রেতারা।
সচেতন মহলের প্রতিনিধি নাসির উদ্দীন মোল্লা বলেন, ‘চক্রটি ইচ্ছাকৃতভাবে কিশোরদের ব্যবহার করছে, যাতে ধরা পড়লেও মূল হোতারা আড়ালে থাকেন।’ স্থানীয় আরেকজন সামাজিক কর্মী জানান, মাদকাসক্তির প্রভাবের কারণে এসব এলাকায় চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েই চলেছে। বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক সামগ্রী, মোটরপাম্প, টিউবওয়েল, এমনকি সেপটিক ট্যাংকের ঢাকনা পর্যন্ত চুরির ঘটনাও ঘটছে এখানে।
বরগুনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক গোলাম হায়দার স্বপন বলেন, ‘মাদকের প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপরই পড়ে না, এর প্রভাবে ধ্বংস হচ্ছে পরিবার ও সমাজ। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ভবিষ্যতের জন্য আরো ভয়াবহ সঙ্কেত দিচ্ছে।’ মাদক প্রতিরোধে তিনি সামাজিক প্রতিরোধ জোরদার করার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর জোর দেন। এ বিষয়ে বরগুনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো: আলী হায়দার রাসেল বলেন, ‘নিয়মিত অভিযানে ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক মাদক সেবনকারী ও কারবারিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মূল ডিলারদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’ তিনি আরো জানান, জেলা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং সমন্বিত ও টেকসই পদক্ষেপ ছাড়া মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে না। নৌপথে নজরদারি বাড়ানো, মাদক স্পটগুলো উচ্ছেদ এবং মূল চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি আরো জোরালো হচ্ছে।



