ধানে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃষি বহুমুখীকরণের তাগিদ

জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, গবেষণা ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান সেমিনারে

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য এখন নতুন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার এই অর্জন ধরে রেখেই কৃষিকে বহুমুখী ও জলবায়ু সহনশীল খাতে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ কৃষি বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, শুধু ধাননির্ভর কৃষি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। বরং এখন প্রয়োজন জমির পুনর্বিন্যাস, বিকল্প ফসলের সম্প্রসারণ, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ গবেষণা ও বিনিয়োগ।

কাওসার আজম
Printed Edition

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য এখন নতুন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার এই অর্জন ধরে রেখেই কৃষিকে বহুমুখী ও জলবায়ু সহনশীল খাতে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ কৃষি বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, শুধু ধাননির্ভর কৃষি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। বরং এখন প্রয়োজন জমির পুনর্বিন্যাস, বিকল্প ফসলের সম্প্রসারণ, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ গবেষণা ও বিনিয়োগ।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাকশন ফর সাস্টেইনেবল এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য উঠে আসে। এর আয়োজন করে বাংলাদেশ একাডেমি অব এগ্রিকালচার (বিএএজি)। অনুষ্ঠানের সহযোগী ছিল কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন, সুপ্রিম সিড, এসিআই, কৃষিবিদ গ্রুপ ও ইস্পাহানি গ্রুপ।

কৃষি বিজ্ঞানী অধ্যাপক লুৎফুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মোট সাতটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ধান, মাছ, ফসল ও পশুসম্পদের টেকসই উন্নয়ন।

প্রতিদিন কমছে ৩১৭ একর কৃষিজমি : সেমিনারের শুরুতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. আব্দুস সালাম বলেন, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩১৭ একর আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, রাস্তা নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজে কৃষিজমি ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সাথে দেশে প্রতি বছর ১ দশমিক ১২ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। ২১০০ সালের মধ্যে দেশে তাপমাত্রা ১ থেকে ৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। লবণাক্ততা বাড়তে পারে ১৪ থেকে ২৭ শতাংশ। বন্যার তীব্রতাও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।’

ড. আব্দুস সালাম জানান, দেশের ১২ শতাংশ মানুষ এখনো অপুষ্টিতে ভুগছে। এ ছাড়া প্রায় ২৪ শতাংশ মানুষ পুষ্টিঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোয়ালিটি বীজ নিশ্চিত করতে পারলে উৎপাদন আরো বাড়বে। কিন্তু পাবলিক ও প্রাইভেট খাত মিলেও এখন মাত্র ৩০ শতাংশ বীজের জোগান দিতে পারছে। বাকি ৭০ শতাংশ বীজ আসছে কৃষকপর্যায় থেকে।’

ধানভিত্তিক কৃষিতে ‘৪আর’ কাঠামোর প্রস্তাব : জমির পুনর্বিন্যাস, বহুমুখীকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতার জন্য ৪আর কাঠামো’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও বিএএজি ফেলো ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস। তার সাথে ছিলেন বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক এন সি ডি বর্মা এবং ব্রির সাবেক মহাপরিচালক মো: শাহজাহান কবির।

গবেষণায় বলা হয়, দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৭৬ শতাংশে ধান চাষ হয়। বর্তমানে ধান উৎপাদন প্রায় ৪ কোটি ৭ লাখ টন। তবে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ধানী জমির একটি অংশ বিকল্প ফসলে নেয়া সম্ভব।

ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, ‘বাংলাদেশ ধানে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে জমির একটি অংশ বহুমুখী কৃষিতে নেয়ার। তিনি কৃষি রূপান্তরের জন্য ‘৪আর’ কাঠামোর প্রস্তাব দেন। এগুলো হলো- রিটেইন (জবঃধরহ)-শক্তিশালী ধানভিত্তিক ভিত্তি ধরে রাখা; রিঅ্যালোকেট (জবধষষড়পধঃব)-ধানের জমির সীমিত অংশ পুনর্বণ্টন; রেইনফোর্স (জবরহভড়ৎপব)-পতিত জমির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং রিডিউস (জবফঁপব)-গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমানো।

বোরোর ওপর নির্ভরতা কমানোর আহ্বান : গবেষণায় বোরো ধানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকির কথাও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, বোরো চাষে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের কারণে পরিবেশগত চাপ বাড়ছে। তাই আউশ ও আমনের আবাদ ও ফলন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

গবেষকরা বলেন, খরিফ-২ মৌসুমে ভুট্টা, ডাল, তিল, মুগডাল ও ক্ষুদ্র শস্য চাষ বাড়াতে হবে। পানি নিষ্কাশন উপযোগী এলাকায় সবজি চাষ বাড়ালে কৃষকের আয় ও পুষ্টি নিরাপত্তা দুটোই বাড়বে। বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ভাসমান সবজি চাষকে জলবায়ু অভিযোজন কৌশল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। চরাঞ্চলে চীনাবাদাম ও ভুট্টা চাষের সুপারিশ করা হয়।

পতিত জমিতে উৎপাদনের সুযোগ : গবেষণায় বলা হয়, দেশে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর পতিত জমি রয়েছে। এসব জমি চাষের আওতায় আনতে পারলে ১৩ থেকে ১৮ লাখ টন পর্যন্ত অতিরিক্ত ধান উৎপাদন সম্ভব। বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর পতিত জমির কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া হাওর এলাকা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, উপকূলীয় চরাঞ্চল ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জলবায়ু ঝুঁকিতে কৃষি : বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. এম জাহিরউদ্দিন তার উপস্থাপনায় বলেন, একক ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এখন দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের আয় ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৭৪ শতাংশ ধান চাষের আওতায়। স্বাধীনতার পর ধান উৎপাদন তিনগুণের বেশি বাড়লেও গম, ডাল, তেলবীজ, ভুট্টা ও শাকসবজিতে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। ড. জাহিরউদ্দিন বলেন, ‘দ্রুত বহুমুখীকরণ না করলে আমদানিনির্ভরতা আরো বাড়বে।’

কমছে আবাদযোগ্য জমি, বাড়ছে লবণাক্ততা : গবেষণায় বলা হয়, ২০০০ সালে দেশে আবাদযোগ্য জমি ছিল ৯ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন হেক্টর। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১১ মিলিয়ন হেক্টরে। প্রতি বছর প্রায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে। একই সাথে জলবায়ু ঝুঁকিও বাড়ছে। দেশে প্রতি দশকে গড় তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে বছরে প্রায় ৩ মিলিমিটার। গত ৩৫ বছরে লবণাক্ততা বেড়েছে ২৬ শতাংশ। বরেন্দ্র, চরাঞ্চল, উপকূল, হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

কৃষি উপকরণ ও মাটির সঙ্কট : গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশ এখনো টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের জন্য ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। দেশের ছয়টি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে চারটি বন্ধ রয়েছে। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। কিছু এলাকায় আর্সেনিক দূষণও বাড়ছে। এ ছাড়া মাটিক্ষয়, লবণাক্ততা, অম্লতা বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা দেশের কৃষিকে হুমকির মুখে ফেলছে। ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক ও বোরনের ঘাটতিও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

গবেষণায় সমন্বয়ের তাগিদ : ‘বাংলাদেশের কৃষির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের গবেষণা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও বিএলআরআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ড. নাথুরাম সরকার। তিনি বলেন, ‘গবেষণা ও উদ্ভাবনই বাংলাদেশের টেকসই কৃষির মূল চাবিকাঠি।’ তিনি সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএআরসি, বারি, ব্রি, বিনা, বিজেআরআই, বিএসআরআই, বিএলআরআই ও বিএফআরআইয়ের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তবে সীমিত বাজেট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দক্ষ গবেষকের সঙ্কটকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।

বেসরকারি খাতের অবদানও তুলে ধরা হয় গবেষণাপত্রে। বলা হয়, ধানের হাইব্রিড বীজের ৯৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ, ভুট্টার বীজের ৯৯ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং হাইব্রিড সবজি বীজের ৯৯ শতাংশ সরবরাহ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

সেমিনারে সাবেক কৃষি সচিব ড. আনোয়ার ফারুক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ড. হামিদুর রহমান, লাল তীর সিডের এমডি ড. মাহবুব আনাম, এসিআইয়ের পরিচালক মিজানুর রহমানসহ কৃষি বিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য দেন।