শাহ আলম নূর
বাংলাদেশে স্টার্টআপ এবং নতুন উদ্যোগের প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং শিল্প বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রবণতা শুধু নতুন ব্যবসার বিকাশ ঘটাচ্ছে না, বরং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
সর্বশেষ সরকারি ও বেসরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নতুন রেজিস্ট্রেশন হওয়া স্টার্টআপের সংখ্যা ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, কৃষি প্রযুক্তি (অ্যাগ্রি-টেক), স্বাস্থ্যসেবা এবং ই-কমার্স খাতে এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার বিভিন্ন ইনকিউবেটর ও অ্যাকসেলারেটর থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, প্রযুক্তি খাতের স্টার্টআপ ২০২৫ সালে মোট নতুন উদ্যোগের প্রায় ৪৫ শতাংশ দখল করেছে। উদ্যোক্তারা মূলত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপ, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমাধান তৈরিতে মনোনিবেশ করছেন।
মোহাম্মদ আরিফ, একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপ ইনকিউবেটর ‘টেকনেস্ট’ এর প্রতিষ্ঠাতা, নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশে প্রযুক্তি স্টার্টআপের প্রতি বিনিয়োগ বাড়ছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা নতুন আইডিয়া ও উদ্ভাবনী সমাধানে আগ্রহী। এর ফলে শুধু ব্যবসা নয়, নতুন দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর চাহিদাও বাড়ছে।
তিনি বলেন, স্টার্টআপ এবং নতুন উদ্যোগের বৃদ্ধি সরাসরি কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলছে। প্রতি নতুন স্টার্টআপ গড়ে ২০-৫০ জনকে চাকরির সুযোগ দেয়। এর মধ্যে সাইবার সিকিউরিটি, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, লজিস্টিক এবং কাস্টমার সার্ভিসের মতো পদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। গ্রামীণ ও অর্ধ-শিল্পাঞ্চলেও নতুন উদ্যোগের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং হ্যান্ডক্র্যাফট খাতে ছোট উদ্যোক্তারা স্থানীয় শ্রমিক নিয়োগ করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নিচ্ছেন বলে তিনি জানান।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন উদ্যোগগুলো ফ্রিল্যান্স এবং দূর-অফিস কাজের সুযোগও তৈরি করছে। তাই যুবসমাজের মধ্যে উদ্ভাবনী উদ্যোগে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ই-কমার্সের বাজার এখনো তত বড় হয়নি। কিন্তু করোনার সময়ে হঠাৎ করেই বাজার বেড়ে যায়। গড়ে ওঠে নানা প্রতিষ্ঠান। করোনার প্রভাব চলে যাওয়ার পর মানুষ আবার প্রচলিত জীবনধারায় ফিরে যায়।
এদিকে সরকারও স্টার্টআপ খাতকে উৎসাহিত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ নীতি ২০২৪’ অনুযায়ী, নতুন উদ্যোগগুলো কর সুবিধা, বিনিয়োগ প্রণোদনা এবং উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণে সহায়তা পাচ্ছে। পরিবর্তিত নীতি এবং ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার কারণে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু করা আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তারা বিনামূল্যে লিগ্যাল, মার্কেটিং এবং প্রযুক্তিগত পরামর্শ পাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদিও স্টার্টআপ খাত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে মূল চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব, প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি এবং বাজারে প্রতিযোগিতা। তারা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের আরো সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব।
এদিকে নারী উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় নারী কর্মীও এই খাতে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করছেন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের ফলে নারীর অংশগ্রহণ ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি সমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আজকের ডিলের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর নয়া দিগন্তকে বলেন, ই-কমার্সের বাজার এখনো তত বড় হয়নি। করোনার সময়কে ধরে যেসব ব্যবসা শুরু হয়েছিল, তারা এখন বাজারের আসল চরিত্রটা বুঝতে পারছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও স্টার্টআপ খাতে আগ্রহী হচ্ছেন। ২০২৫ সালে এ খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের প্রায় ২০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ এসেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, হেলথ-টেক এবং অ্যাগ্রি-টেক খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বাংলাদেশের বাজার সম্ভাবনাময়। এখানে যুবসমাজ সৃজনশীল এবং দ্রুত নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করছে। ফলে, স্থানীয় উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, স্টার্টআপ ও নতুন উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছে না, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও সম্প্রসারণ করছে। এটি বাংলাদেশকে ডিজিটাল এবং উদ্ভাবনী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, নতুন উদ্যোগগুলো যুবসমাজের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে। তারা শুধুমাত্র চাকরি পাচ্ছে না, বরং নতুন দক্ষতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক মানের কাজের সাথে পরিচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে স্টার্টআপ ও নতুন উদ্যোগের কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো দ্বিগুণ হবে। দেশের অর্থনীতি আরো উদ্ভাবনী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার পথে এগোচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।



