মো: আল আমিন কিশোরগঞ্জ
সকাল থেকেই কিশোরগঞ্জের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। সেই সাথে বৃষ্টির শঙ্কাও। তবে বেলা বাড়ার সাথে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ে। মেঘের ফাঁকে কয়েকবার উঁকি দেয় সূর্য। এ রকম নরম আবহাওয়ায় শোলাকিয়া ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত।
ঐতিহ্যবাহী এই ঈদগাহে ২১ মার্চ শনিবার ঈদের দিন সকাল ১০টায় শুরু হয় জামাত। এতে এবার স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি মুসল্লি অংশ নেন।
রেওয়াজ অনুযায়ী জামাত শুরুর পাঁচ মিনিট, তিন মিনিট ও এক মিনিট আগে তিনটি, দুইটি ও একটি বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। জামাতে ইমামতি করেন মুফতি মাওলানা আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। জামাত শেষে খুতবার পর দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মার শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে মুনাজাত করেন ইমাম। মুনাজাতে ৪৭-এর আজাদি, ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও সংগ্রামীদের স্মরণ করা হয়। পাশাপাশি বিশ্ব থেকে যুদ্ধ বন্ধ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও মুসলমানদের হেফাজতের প্রার্থনা করা হয়।
ঈদের জামাতে অংশ নেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো: শরিফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-১ (সদর ও হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো: মাজহারুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেনসহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, কর্মজীবী, ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা সরকারি বিভিন্ন সংস্থার বরাত দিয়ে ধারণা দেন, এবার শোলাকিয়া ঈদগাহে ঈদুল ফিতরের জামাতে ৬ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। বিগত আ’লীগ সরকারের সময়ে বিতর্কিত মাওলানা ফরীদ উদদীন মাসউদকে ইমাম নিয়োগ দেয়ায় এই ঈদগাহ ঐতিহ্য হারাতে বসেছিল। দিন দিন মুসল্লির সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে দীর্ঘ ১৫ বছর পর মুসল্লিদের পছন্দের ও ঈদগাহের বৈধ ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহকে পুনর্বহাল করা হয়। এ কারণে এবার মানুষের আগ্রহ ছিল এই মাঠের দিকে বেশি। কিশোরগঞ্জ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলার মুসল্লিরা এই ঈদজামাতে অংশ নেন।
উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় এই ঈদগাহে জামাতে নামাজ আদায় করার জন্য দুই দিন আগে থেকেই মুসল্লিরা আসতে শুরু করেন।
ঈদের দিন ফজর থেকে জেলা শহরের সবগুলো সড়ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। টুপি-পাঞ্জাবি পরা মুসল্লিরা আসতে থাকেন ঈদগাহের দিকে। মানুষের ঢল নামে শোলাকিয়ার দিকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে মুসল্লিদের ভিড়ে ঈদগাহ পরিণত হয় জনসমুদ্রে। মাঠে জায়গা না পেয়ে বেশিরভাগ মুসল্লি মাঠের দুই পাশের সড়কে, আশপাশের বাসাবাড়ির উঠান ও ছাদে অবস্থান নেন। নারীদের জন্য ঈদগাহে আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় মাঠের পাশের বিভিন্ন বাড়িতে বসে মুনাজাতে অংশ নেন তারা।
জামাত শুরুর ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথে মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের রাস্তা, ফাঁকা জায়গা, বাড়ি, বাড়ির ছাদে নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন মুসল্লিরা। পুলিশ সুপার ফাঁকা গুলি ছুড়েন। ইমাম আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করেন। আনন্দে টইটম্বুর মাঠ।
শোলাকিয়ার ইতিহাস অনেক পুরনো। ঈদগাহের অবস্থান কিশোরগঞ্জ শহরে। ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই অতিথিদের সমাগমে সরগরম হয় শহরের হোটেল। স্থানীয়দের বাড়িতে আসেন দূরের আত্মীয়রা।
শহরের মোড়ে মোড়ে তৈরি হয় তোরণ। মাঠের পাশে বসে পণ্যের মেলা।
একটা সময় দূর থেকে আসা অনেক মুসল্লি থাকতেন মাঠের মিম্বরের নিচে। দু’তলা এই মিম্বরে ঈদের নামাজ ছাড়াও দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয়। কিন্তু হাল আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়িতে ওখানে থাকার সুযোগ নেই। মাঠের গোড়ার দিকে, দূর থেকে আসা মুসল্লিদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি মুসাফিরখানা। শোলাকিয়া মাঠ শহরের পুবদিকে। আর মুসাফিরখানাটি পশ্চিমে, হয়বতনগর জমিদারবাড়িতে। এখন অবশ্য মুসাফিরখানাটি নেই।
শোলাকিয়া ঈদগাহের বয়স প্রায় দুইশ বছর। তবে হয়বতনগর জমিদারবাড়ির নথির ভিত্তিতে এর বয়স আড়াইশো বছরেরও বেশি। তখন এলাকাটির নাম ছিল রাজবাড়িয়া। এর বুক কেটে বয়ে যেত নরসুন্দা নদী। ওই নদীতে ছিল একটি ঘাট। ঘাটের পাশে বসত হাট। আর ওই হাটের নাম ছিল ইচ্ছাগঞ্জ।
তখন বার ভূঁইয়ার একজন ইশা খাঁর একটি দুর্গ ছিল কিশোরগঞ্জ থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে জঙ্গলবাড়িতে। তার সময় ইয়েমেন থেকে রাজবাড়িয়ায় আসেন সৈয়দ আহাম্মাদ নামে এক সাধক। ১৮২৮ সালে তিনি এই মাঠের জন্য জমি দান করেন। ধারণা করা হয় ওই বছরই শোলাকিয়ায় প্রথম ঈদের জামাত হয়। তবে অন্য একটি হিসাব বলছে ঈদগাহের শুরুটা হয়েছে ১৭৫০ সালে। তখন দুই ঈদে দুইটি জামাত হয়েছিল।
মূলত সাধক সৈয়দ আহাম্মাদ ও হয়বতনগরের জমিদার মান্নান দাদ খানের দান করা জমিতেই বর্তমান শোলাকিয়া ঈদগাহ গড়ে উঠেছে।
মাঠের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরের আয়তন ছয় দশমিক ছয় এক একর। আর প্রাচীরের বাইরে ওজুখানা, পুকুর ও টয়লেটের স্থান মিলিয়ে সাত একর। মাঠে সারি আছে ২৬৫টি। প্রতি সারিতে লোক দাঁড়াতে পারেন ৫০০ জন। সে হিসাবে মাঠের ভেতরে মুসল্লির সংখ্যা হয় সোয়া লাখের কিছু বেশি। কিন্তু প্রায় প্রতি বছরই মাঠ উপচে লোক হয়। ভেতরে যত লোক, বাইরেও তার চেয়ে অনেক বেশি। তারা সড়কে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েন। মরা নদী নরসুন্দার ওপারেও কাতার দাঁড়ায়। আশপাশের বাড়ির উঠান, ছাদ হয়ে যায় জামাতের অংশ।



