দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে অর্থ লুটপাটে জড়িতদের পুনর্বাসন নয়, বরং দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলেছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সুশাসনের অভাব ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত গভীর সঙ্কটে পড়েছে। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণে কঠোর সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘দেশের ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়; প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টর : জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন। ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাক চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মঈনউদ্দীন আহমেদ এবং বারভিডা সভাপতি মো: আব্দুল হক।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কলুষিত নীতি প্রক্রিয়া ও সুশাসনের অভাবই ব্যাংক খাতের বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ। আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক সরকারের অপরাধমূলক আচরণের ফলেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের এই বিপর্যয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা না করলে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে।’
তিনি আরো বলেন, ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টের ১৮(ক) ধারার কোনো অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা নেই, এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ব্যাংক খাতকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পেশাদারিত্ব ও সময়োপযোগী সাহসী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। যারা ব্যাংক খাত লুটপাট করেছে, তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ দেয়ার চেষ্টা কাম্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ব্যাংক খাতের লুটপাটকারীদের অবশ্যই বিচার ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে, অন্যথায় ভবিষ্যতে আরো বড় অনিয়ম উৎসাহিত হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, লুটপাটকারীদেরই আবার পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং ইসলামী ব্যাংক দখলের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইকোনমিক্সের ডিন ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, তৎকালীন সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকারি এজেন্সি, মিডিয়া এলিট ও কিছু অর্থনীতিবিদ কেউই ব্যাংক খাতের লুটপাটের দায় এড়াতে পারেন না। ইসলামী ব্যাংক সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হওয়ায় এটি পরিকল্পিতভাবে দখল করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী ছিল এবং এসব ঘটনার বিচার কোথায়।
ফারুক মঈনউদ্দীন আহমেদ বলেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় বেশি বিনিয়োগ দিতে পারে, তাই একটি গোষ্ঠী এসব ব্যাংককে টার্গেট করেছিল। সরকার নীতিগত সহায়তা দিয়ে ব্যাংক লুটপাটে সহযোগিতা করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, ঋণখেলাপিদের কোনো ধরনের ছাড় দেয়া উচিত নয় এবং সুশাসন ছাড়া ব্যাংকিং খাতকে সঠিক পথে ফেরানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আব্দুল আওয়াল সরকার বলেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাউকে নিয়োগের আগে নৈতিক যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। ব্যাংকিং খাত লোপাটের পেছনে শরিয়াহ কাউন্সিলেরও দায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এফবিসিসিআই এর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক আবুল কাসেম হায়দার বলেন, গত তিন মাসে প্রায় ৩০০ শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং নতুন বিনিয়োগ আসছে না। ব্যাংক লুটেরাদের কারণে সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকই সঙ্কটে পড়েছে। তিনি ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন ব্যাংক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং ইসলামী ব্যাংকিং আইন দ্রুত পাসের দাবি জানান।
বিজিএমইএ স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান বলেন, ইসলামী ব্যাংক ব্যবসায়ীদের আস্থা ও ভরসার জায়গা ছিল। ব্যাংকের সঙ্কটের কারণে ব্যবসায়ীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তাদের হাতে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দিলে ব্যাংকটি আবার সাফল্যের ধারায় ফিরতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আস্থা ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংক ভালো থাকলে দেশের অর্থনীতিও ভালো থাকবে। তিনি বলেন, ‘এস আলম ও তার দোসরদের আর কোনোভাবেই ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেয়া হবে না।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষক ও কলামিস্ট ড. মো: মিজানুর রহমান। তিনি দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সঙ্কট, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ভূমিকা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব তুলে ধরেন।
সেমিনারে আলোচনার ভিত্তিতে ১১ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক লুট ও অনিয়মের দ্রুত বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন, ২০১৭ সালের পর দখল হওয়া ব্যাংকের মালিকানা পূর্ববর্তী মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া, খারাপ ঋণ ব্যবস্থাপনায় পৃথক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিচালনা বোর্ড নিশ্চিত করা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ চালু, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন অডিট ও নজরদারি জোরদার এবং ইসলামী ব্যাংকের পরিচালকদের জন্য শরিয়াহ জ্ঞান বাধ্যতামূলক করা।
সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন ওবায়দুর রহমান, নাসির উদ্দিন ভুঁইয়া রতন, নুরুল ইসলাম খলিফা, মো: নুরুল ইসলাম, মো: শফিকুল মওলা, মো: হুমায়ুন কবীর, আব্দুল মান্নান, ইঞ্জিনিয়ার মো: আবুল বাশার, আব্দুস সাদেক ভূঁইয়া, মো: আব্দুল জব্বার, মোহন মিয়া, মো: কবীর হোসেন, মো: হাবিবুর রহমান, মো: মোশাররফ হোসেন, মো: মাহফুজুর রহমান, আগা আজিবুর রহমান, মো: মাসুদ কবির, রুবায়েত আহমেদ এবং দেলোয়ার হোসেন।
বক্তারা বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা এবং আস্থা পুনরুদ্ধারে দ্রুত সংস্কার কার্যকর করা জরুরি। অন্যথায় দেশের অর্থনীতি আরো বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।



