৪ বছরে সর্বোচ্চ সূচক পতন পুঁজিবাজারে

কিছু মানুষের খেয়াল-খুশির বলি হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ দরপতনের ঘটনা ঘটেছে দেশের পুঁজিবাজারে। গতকাল মঙ্গলবার দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের বড় অবনতি ঘটে যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর একদিনে দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকের আর এত অবনতি ঘটেনি। এর আগে গত রোববার ইরানে মার্কিন হামলার পরদিন লেনদেনের শুরুতে দুই পুঁজিবাজার সূচকের বড় অবনতি ঘটলেও শেষদিকে এসে হারানো সূচকের অনেকটাই ফিরে পায় বাজারগুলো। কিন্তু গতকাল দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানা বিক্রয়চাপের মুখে ছিল বাজারগুলো।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। তারা মনে করেন, প্রথমদিন যেভাবে মনে হচ্ছিল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে না, এখন কিন্তু তা মনে হচ্ছে না। সামনের দিনগুলোতে এ যুদ্ধের প্রভাব আরো বাড়তে পারে বলেই মনে হচ্ছে। এটাই পুঁজিবাজার আচরণকে প্রভাবিত করছে। আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। কারণে ২০২২ সালের ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশের পুঁজিবাজারগুলো যে সঙ্কটের মধ্যে ছিল তার রেশ চলছে এখনো। তাই বিনিয়োগকারীরা আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২০৮ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ৫৩৪ দশমিক ০৪ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি মঙ্গলবার লেনদেন শেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৩২৫ দশমিক ০৬ পয়েন্টে।

একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৮৫ দশমিক ৭২ ও ৩৬ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৪২৭ দশমিক ৫০ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৪৬৫ দশমিক ২৯ ও ২৮০ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট।

সূচকের অবনতি ঘটলেও গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনের উন্নতি ঘটে। ঢাকা শেয়ারবাজার এদিন ৮৮৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১০৬ কোটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৭৭৯ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ১৯ কোটি টাকা থেকে ২৩ কোটিতে পৌঁছে লেনদেন।

সকালে লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপে পড়ে দুই পুঁজিবাজার। ঢাকা শেয়ারবাজারে পনেরো মিনিটের মাথায় ডিএসই্র প্রধান সূচকটি নেমে আসে পাঁচ হাজার ৪৪২ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির অবনতি ঘটে ৯২ পয়েন্ট। এরপর সাময়িকভারে ঊর্ধ্বমুখী আচরণ করে সূচকটি। পরবর্তী কয়েক মিনিটে হারানো সূচকের একটি অংশ ফিরে পায় বাজারটি। কিন্তু বেলা পৌনে ১১টার দিকে নতুন করে বিক্রয়চাপ তৈরি হয় যা ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করে। বেলা যতই বাড়তে থাকে ততই বাড়তে থাকে বিক্রয়চাপ। দিনশেষে সূচকের পতন দাঁড়ায় ২০৮ দশমিক ৯৮ পয়েন্টে।

এদিকে গতকালের পুঁজিবাজার আচরণের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব যেমন দায়ী তেমনই পুঁজিবাজারের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনকেও দায়ী মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। গতকাল বিভিন্ন ব্রোকার হাউজের ট্রেডিং ফ্লোরে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললে তারা এ ধরনের অভিযোগ করেন। একজন বিনিয়োগকারী নয়া দিগন্তকে বলেন, যুদ্ধের কারণে রোববার বড় ধরনের দরপতনের ঘটনা ঘটলেও সোমবার তার অনেকটাই কাটিয়ে ওঠে বাজারগুলো। কিন্তু আজ (গতকাল) সকাল থেকেই তীব্র বিক্রয়চাপে অস্থির হয়ে উঠেছে পুঁজিবাজার সূচক। এর পেছনে বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যানের থাকা না থাকাই বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন তারা। তাদের মতে, বাজারের একটি অংশ চাচ্ছে বর্তমান চেয়ারম্যান চলে যাক। বিপরীতে বাজার সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো ব্যক্তি ওই পদে আসতে চাচ্ছেন। আর এটাকে ঘিরেই চলছে সূচকের টালমাটাল অবস্থা। একদিন আগে বাজারে চাউর ছিল বর্তমান চেয়ারম্যান চলে যাচ্ছেন। সে কারণে সোমবার বাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। আর আজ (গতকাল) শোনা যাচ্ছে উনি আজ অফিস করছেন। এ কারণে কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বিক্রয়চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর এভাইে কিছু মানুষের খেয়ালখুশির বলি হচ্ছেন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী যাদের বিএসইসির চেয়ারম্যান কে হচ্ছেন তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা চান একটি স্বচ্ছ ও সুন্দর পুঁজিবাজার যেখানে তাদের পুঁজি নিরাপদ থাকবে।

গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের প্রায় ৯০ শতাংশই দরপতনের শিকার হয়। সব খাতের কোম্পানি ছিল এ পতনের তালিকায়। কয়েকটি খাত বাদে অন্যগুলোর শতভাগ কোম্পানিই দর হারায় এদিন। কিছু কিছু খাতে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানিই প্রচণ্ড বিক্রয়চাপের মধ্যেও দর ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এখানে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯১টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল মাত্র ৩১টি। বিপরীতে দর হারায় ২৪৯টি। অপরিবর্তিত ছিল ১১টির দর। অপরদিকে, চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ২১৪টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৪৪টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দরপতনের শিকার ছিল ১৫৭টি সিকিউরিটিজ। এখানে দর অপরিবর্তিত ছিল ১৩টির।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বরাবরের মতো গতকালও লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি সিটি ব্যাংক। ৫৫ কোটি ২০ লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ৭১ লাখ ৫৯ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৩১ কোটি ৮৯ লাখ টাকায় এক কোটি দুই লাখ ছয় হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে টেলিযোগাযোগ খাতের বহুজাতিক কোম্পানি রবি অজিয়াটা উঠে আসে দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ওরিয়ন ইনফিউশন, ব্র্যাক ব্যাংক, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, যমুনা ব্যাংক ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।