৪ মাসের সর্বনিম্ন লেনদেন ডিএসইতে

বিনিয়োগের নামে মিউচুয়াল ফান্ড তহবিলের অপব্যবহার

৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৯ কোটি টাকা জরিমানা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের তহবিল নিয়ে বিনিয়োগের নামে ফান্ডের অর্থ লোকসানি ও কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানিতে বিধিবহির্ভূতভাবে বিনিয়োগের অভিযোগে মোট ৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৯ কোটি টাকা জরিমানা করেছে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২১ অক্টোবর চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশনের ৯৭৮তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কমিশনের পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

দণ্ডিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলামসহ মোট ছয় পরিচালককে এক কোটি টাকা করে মোট ছয় কোটি টাকা এবং মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ট্রাস্টি বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে তিন কোটি টাকা, মিথ্যা তথ্য দেয়ায় কোয়েস্ট বিডিসির চেয়ারম্যান রেজাউর রহমান সোহাগকে ১০ লাখ টাকা এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) শরিফ আহসানকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া পরিকল্পিত এই আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার প্রমাণ নিশ্চিত হওয়ায় তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম ও এল আর গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলামকে পুঁজিবাজারের সব কার্যক্রম থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিএসইসি জানায়, এলআর গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি পরিচালিত ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ডের মোট ২৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত পদ্মা প্রিন্টার্স অ্যান্ড কালার লিমিটেডে (যা পরবর্তীতে কোয়েস্ট বিডিসি লিমিটেড হিসেবে নিবন্ধিত) বিনিয়োগ করা হয়েছিল। অথচ তখন কোম্পানির কোনো কার্যক্রম ছিল না। এমতাবস্থায় প্রতিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার ৩৮৯ দশমিক ৪৮ টাকা করে ৫১ শতাংশ শেয়ারের অধিগ্রহণ করা হয়। কোম্পানিটির শেয়ার তখন ডিএসইর ওটিসি বোর্ডে ১৩ দশমিক ৬৮ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছিল। ওই সময় (৩০ জুন ২০২২ অনুযায়ী) কোম্পানিটির সম্পদমূল্য ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৭৪ টাকা এবং নেগেটিভ রিটেইন আর্নিং ছিল ২ দশমিক ৩৫ টাকা।

পরবর্তীতে মিউচুয়াল ফান্ড থেকে মনোনীত পরিচালকদের মাধ্যমে কোম্পানিটির নতুন বোর্ড গঠন করা হয় এবং কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে ‘কোয়েস্ট বিডিসি লিমিটেড’ নামকরণ করা হয়। তা ছাড়া কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে ১ দশমিক ৬০ কোটি টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। এবার ওই ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে প্রতিটি শেয়ার ১৫ দশমিক ৮৮ টাকা দরে মোট ৪৫ দশমিক ০২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়। এ সময় কোম্পানিটির পূর্বতন শেয়ারহোল্ডারদের কোনো শেয়ার দেয়া হয়নি। আবার উল্লিখিত ক্ষেত্রে বিধি মোতাবেক মূল্য সংবেদনশীল কোনো তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি। বিধি মোতাবেক কোনো বিশেষ সাধারণ সভার আয়োজন করা হয়নি এবং বিধি মোতাবেক প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ইস্যুকৃত শেয়ারের লক-ইন করা হয়নি। লোকসানি ফান্ডগুলো থেকে এভাবে দুই পর্যায়ে মোট ৬৮ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে ইউনিট হোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণœ করা হয়।

এই বিধিবহির্ভূত বিনিয়োগের মাধ্যমে ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণœ হওয়ায় বিএসইসি ছয়টি ফান্ড থেকে বিনিয়োগ করা ৬৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা সুদসহ মোট ৯০ কোটি টাকা ৩০ দিনের মধ্যে ফেরত আনতে নির্দেশ দিয়েছে। যদি এই অর্থ ফেরত আনতে ব্যর্থ হয়, তবে রিয়াজ ইসলামকে অতিরিক্ত ৯৮ কোটি টাকা, পরিচালক জর্জ এম স্টক থ্রিকে এক কোটি টাকা এবং রেজাউর রহমান সোহাগকে এক কোটি টাকা জরিমানা দিতে হবে। মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০০১ লঙ্ঘনের দায়ে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশকে এই ছয় ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব থেকে অপসারণের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে কমিশন।

এ ছাড়া কোয়েস্ট বিডিসি লিমিটেডের ৩০ জুন ২০২৩ তারিখে সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষুণœ হওয়ায় নিরীক্ষক শফিক বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিষয়টি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলে (এফআরসি) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

অন্যদিকে, কোয়েস্ট বিডিসি লিমিটেড ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার ৫২ টাকা ২৫ পয়সা দরে মোট ২৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা থাইরোকেয়ার বাংলাদেশ লিমিটেডে বিনিয়োগ করা হয়। এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শেয়ারের মূল্যায়ন (ভ্যালুয়েশন) করেছে সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেস লিমিটেড। সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেস লিমিটেডের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এরশাদ হোসেন ও রিয়াজ ইসলামের মধ্যে যোগসাজশের ভিত্তিতে শেয়ারের মূল্যায়ন করে মানিলন্ডারিং সংঘটিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হওয়ায় বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এদিকে গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন নেমে এসেছে বিগত চার মাসের মধ্যে সবনি¤œ অবস্থানে। বুধবার ডিএসই ৩৫৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। গত ২৪ জুনের পর ডিএসইর লেনদেন আর এ পর্যায়ে নামেনি। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ডিএসইর লেনদেন এক হাজার ৪৪০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। সেই থেকে টানা পতনের শিকার হয় পুঁজিবাজার। টানা দরপতনের ফলে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও হ্রাস পেতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল ৩৫৫ কোটিতে নেমে আসে পুঁজিবাজারটির লেনদেন।