ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠিত হয়। তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পাওয়া সরকারদলীয় নেতাদের নজর আসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতির দিকে। সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ এপ্রিল। তবে, এই সময়ের মধ্যে ‘আকাক্সিক্ষত’ সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন হচ্ছে না বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সংসদ নেতার পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো নির্দেশনা পায়নি চিফ হুইপ অফিস। আগামী জুন মাসে বাজেট অধিবেশনে এই কমিটি গঠিত হবে বলে জানা যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে কার্যকর করা এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে নজরদারিতে মুখ্য ভূমিকা রাখে সংসদীয় কমিটি। যদিও এরই মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অত্যাবশ্যক কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই ‘সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি’, ‘সংসদ কমিটি’, ‘বিশেষ কমিটি’, ‘বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’ এবং ‘বেসরকারি সদস্যদের বিল ও সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটি’ গঠন করা হয়।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্যই নতুন। তাদের কার্যক্রম ও দক্ষতা মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলতি অধিবেশন শেষ হলে সংসদ সদস্যদের পারফরম্যান্স সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে, যা পরবর্তী সময়ে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদেরও এই কমিটিতে ঠাঁই দেয়া হবে। সব মিলে এই ধরিগতি।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ মে সংরক্ষিত নারী আসনের (৫০টি) ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত অতিরিক্ত প্রার্থী মনোনয়ন না দেয়ায় প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন অর্থাৎ আগামী ২৯ এপ্রিলই প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। তখন আর ১২ মে পর্যন্ত অপেক্ষার প্রয়োজন হবে না। নবনির্বাচিত সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা শপথ নিয়ে আগামী ৩০ এপ্রিল চলতি অধিবেশনের শেষ দিনে যোগ দিতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টদের একটি সূত্র জানিয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং পরবর্তীতে দু’টি আসনে উপনির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮টি এবং জোটগতভাবে ৭৭টি আসন পেয়েছে। এর বাইরে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য সাতজন এবং ইসলামী আন্দোলনের একজন এমপি রয়েছেন। বাকি ২২২টি আসন পেয়েছে বিএনপি জোট। আইন অনুযায়ী আসন সংখ্যার ভিত্তিতে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হবে। প্রতি ছয়টি আসনের জন্য একটি করে সংরক্ষিত নারী আসন নির্ধারিত থাকায় বিএনপি জোট ৩৬ জন নারী এমপি পাচ্ছে। বিপরীতে জামায়াত জোট ১৩ জন এবং স্বতন্ত্ররা একজন নারী এমপি পাচ্ছে। এনসিপি ছয়টি আসন পাওয়ায় দল হিসেবে একটি এবং জামায়াত থেকে একটি আসন পাচ্ছে বলে জানা যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সংসদীয় রাজনীতিতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। এসব কমিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, আইন প্রণয়নের খসড়া পরীক্ষা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকে। যদিও এসব কমিটির কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই, তবে তাদের সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। এই কমিটিগুলো কার্যত ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করে এবং প্রশাসনের ওপর সংসদের নজরদারি নিশ্চিত করে।
সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদে স্থায়ী কমিটি গঠনের নির্দেশনা রয়েছে। এতে সরকারি হিসাব কমিটি ও বিশেষ অধিকার কমিটি গঠনের বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে অন্যান্য স্থায়ী কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। দ্বাদশ সংসদে মোট ৫০টি কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১১টি সংসদ সম্পর্কিত এবং ৩৯টি ছিল মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, প্রতিটি কমিটিতে সভাপতিসহ মোট ১১ জন সদস্য থাকেন এবং তাদের সবাই সংসদ সদস্য হতে হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদাধিকারবলে সদস্য হিসেবে থাকেন, তবে টেকনোক্রেট কোটার মন্ত্রী হলে তিনি সদস্য হতে পারেন না। সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি করে সংসদ নেতার অনুমোদনে চিফ হুইপের প্রস্তাবের ভিত্তিতে কমিটি গঠন করা হয় এবং এতে কণ্ঠভোটের প্রয়োজন হয়। বিরোধীদলের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নির্দিষ্ট না থাকলেও সাধারণত তাদের মতামতের ভিত্তিতে সদস্য মনোনয়ন দেয়া হয়।
তবে, জুলাই সনদ অনুযায়ী, সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদ বিরোধীদলের সদস্যদের দেয়ার বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে। এ ছাড়া সংসদে আসন সংখ্যার অনুপাতে অন্যান্য (মন্ত্রণালয়সহ) কমিটির সভাপতির পদও বণ্টনের কথা উল্লেখ রয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে একমত হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংসদীয় কমিটির সভাপতিরা আলাদা কোনো সাংবিধানিক পদমর্যাদা না পেলেও তাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। সংসদ ভবনে অফিস, ব্যক্তিগত সহকারী ও অফিস সহকারী প্রদান করা হয়। মাসিক আপ্যায়ন ভাতা হিসেবে ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকে। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ এবং বিদেশ সফরে অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগও থাকে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতা এবং নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের উপনেতা নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ চারটি কমিটিসহ আসন অনুপাতে মোট ১০টির বেশি সংসদীয় কমিটির সভাপতি পাওয়ার কথা জামায়াতের। সে ক্ষেত্রে দলের দুই নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, নুরুল ইসলাম বুলবুলসহ দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা ঠাঁই পেতে পারেন বিভিন্ন কমিটিতে। তবে, সরকার গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে না হাঁটায় ডেপুটি স্পিকার পদটি গ্রহণ করেনি। সেক্ষেত্রে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ গ্রহণ করবে কি না- এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে, মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পাওয়া সিনিয়র নেতাদের সংদীয় কমিটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে সভাপতি করা হচ্ছে বলে জানা যায়। কেউ কেউ আবার এ নিয়ে অধির আগ্রহে অপেক্ষায় আছেন। বিএনপির শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে সাবেক মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ নেতারা ইতোমধ্যে বিভিন্নভাবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া অনেক অভিজ্ঞ নেতা এবার সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদে আসতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেও দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সভাপতি করা হতে পারে।
জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু নয়া দিগন্তকে জানান, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের বিষয়ে এখনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। সংসদ নেতার দিক নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা এই কমিটির তালিকা তৈরি করবো। চলতি অধিবেশনে এই কমিটি না-ও হতে পারে বলে জানান তিনি।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, সংসদ পরিচালনার জন্য জরুরি কমিটিগুলো ইতোমধ্যে গঠন করা হয়েছে। বিশেষ করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাইয়ের জন্য বিশেষ কমিটি কাজ করছে। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক অন্যান্য কমিটি সম্ভবত চলতি অধিবেশনে গঠন করা হবে না, পরবর্তী অধিবেশনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
সংসদ সচিবালয় সূত্র আরো জানায়, কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটির প্রতি মাসে অন্তত একটি বৈঠক করার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করা হয়।
এদিকে, আজ রোববার বিকেল ৩টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন (১৬তম দিন) বসছে। দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের প্রশ্নোত্তর, ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ, গৃহীত নোটিশসমূহের উপর আলোচনা এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।



