ক্রীড়া প্রতিবেদক
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের প্রথম দিনটি বাংলাদেশের জন্য ছিল সংগ্রাম, ধৈর্য ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই পাকিস্তানের পেস আক্রমণের সামনে ধসে পড়ে স্বাগতিকরা। কিন্তু ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখেও এক প্রান্ত আগলে রেখে অনবদ্য শতরানে দলকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যান লিটন দাস। তার ১২৬ রানের অসাধারণ ইনিংসে ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৭৭ ওভারে সব ক’টি উইকেট হারিয়ে ২৭৮ রান সংগ্রহ করে। জবাবে দিনের শেষ ভাগে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তান কোনো উইকেট না হারিয়ে ২১ রান তুলে প্রথম দিন শেষ করেছে। এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের চেয়ে ২৫৭ রানে পিছিয়ে পাকিস্তান।
বাংলাদেশ দলে সাদমানের ইনজুরির কারণে সুযোগ পেয়েছেন তানজিদ তামিম এবং এবাদতের বদলে শরীফুল ইসলাম। একাদশে তিন পরিবর্তন করেছে পাকিস্তান। ইমাম উল হক, নোমান আলি ও শাহীন শাহ আফ্রিদির পরিবর্তে একাদশে জায়গা পেয়েছেন বাবর আজম, সাজিদ খান ও খুররম শেহজাদ।
আগেই জানা ছিল সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উইকেটে ঘাস থাকলেও মিরপুর শেরেবাংলার মতো আচরণ করবে না। ব্যাটসম্যানদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা! সেই আশঙ্কা সত্যি হতে থাকে শুরুতেই। একের পর এক ব্যাটসম্যান ফিরে যেতে থাকলে গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়ে হতাশা। কিন্তু সেই অন্ধকারের মাঝেও একজন ব্যাটার ছিলেন আলাদা। পতনের মধ্যেও তিনি খেলেছেন নিজের মতো করে, মানসিক পরিকল্পনায় ধৈর্য আর সাহস দিয়ে গড়েছেন এক অসাধারণ ইনিংস। দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনের সবটুকু আলো কেড়ে নিয়েছেন উইকেটরক্ষক ব্যাটার লিটন দাস।
বাংলাদেশের শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। পাকিস্তানের অভিজ্ঞ পেসার মোহাম্মদ আব্বাস ইনিংসের শুরু থেকেই নিখুঁত লাইন ও লেংথে আঘাত হানেন। প্রথম বলেই আউট হতে পারতেন ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়। তাতে বাঁচলেও দ্বিতীয় বলেই স্লিপে ক্যাচ তুলে দিয়ে খালি হাতে সাজঘরে ফেরেন। বাংলাদেশ শুরুতেই ব্যাকফুটে চলে যায়।
তবে অভিষিক্ত ওপেনার তানজিদ হাসান কিছুটা ইতিবাচক ব্যাটিংয়ের আভাস দেন। মুমিনুল হকের সাথে জুটি গড়ে ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করেন। তানজিদের ব্যাটে ছিল কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন শট। কিন্তু ভালো শুরুটাকে বড় ইনিংসে রূপান্তর করতে পারেননি এই তরুণ। ৩৪ বলে ২৬ রান করে বিদায় নিলে ভাঙে ৪৪ রানের জুটি।
এরপর দুই অভিজ্ঞ ব্যাটার মুমিনুল হক ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত চেষ্টা করেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। পাকিস্তানের পেসার খুররাম শাহজাদের দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে মুমিনুলের (২২) অফ স্টাম্প ভেঙে গেলে আবারো চাপে পড়ে বাংলাদেশ। একপর্যায়ে শান্ত ও মুশফিকুর ইনিংস সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন। আত্মবিশ^াসের সাথে উইকেটে থিতু হওয়ার পরও শট খেলতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন (২৯) শান্ত। এরপর মুশফিকও ৬৪ বলে ২৩ রান করে এলবিডব্লিউ হন। মিডল অর্ডারে বড় ভরসা মেহেদী হাসান মিরাজও ব্যর্থ হন (৪)।
১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়ে স্বাগতিকরা। শঙ্কা জাগে ১৫০ রানের আগেই গুটিয়ে যাওয়ার। ঠিক সেই কঠিন মুহূর্তে দৃঢ়তা ও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলের হাল ধরেন লিটন দাস। শুরু থেকেই ধৈর্যের পরিচয় দেন। একদিকে উইকেট পড়তে থাকলেও নিজের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক খেলা ও নিয়ন্ত্রিত শট নির্বাচনের সমন্বয়ে পাকিস্তানি বোলারদের বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দেন তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলাম। তাইজুল মাত্র ১৬ রান করলেও লিটনকে সময় দেন ৪০ বল খেলে। সপ্তম উইকেট যোগ করেন ৬০ রান।
তাইজুল আউট হওয়ার পর তাসকিন আহমেদকে নিয়ে কিছুটা লড়াই করেন লিটন। তাসকিনও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। এরপর অষ্টম উইকেটে শরিফুল লিটনকে দৃঢ়তার সাথে সঙ্গ দেন। ৬৮ রানের জুটি ভাঙে লিটন দাসের বিদায়ে। শরিফুল ৩০ বলে ১২ রান করে অপরাজিত থাকেন। চমৎকার ড্রাইভ, স্কয়ার কাট ও পুল শটে রান তুলতে থাকেন লিটন। পাকিস্তানের পেস ও স্পিন-দুই আক্রমণই দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করেন। ১৩৫ বলে ব্যক্তিগত শতকপূর্ণ করেন। এটি ছিল টেস্ট ক্যারিয়ারে তার ষষ্ঠ সেঞ্চুরি। শতকের পরও থেমে থাকেননি। শেষ পর্যন্ত ১৫৯ বলে ১৪টি চার ও ২টি ছক্কায় ১২৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন।
দিনের শেষ দিকে হাসান আলি দ্রুত দু’টি উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ইনিংস গুটিয়ে দেন। প্রথমে ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন লিটন। এরপর নাহিদ রানাকে আউট করে বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তি টানেন। পাকিস্তানের খুররাম শাহজাদ ৪টি, মোহাম্মদ আব্বাস ৩টি, হাসান আলি ২টি উইকেট নেন।
দিনশেষে পাকিস্তান ব্যাট করতে নেমে ৬ ওভারে বিনা উইকেটে ২১ রান করেছে। আবদুল্লাহ ফজল ও আজান অপরাজিত আছেন যথাক্রমে ৮ ও ১৩ রানে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর- (টস-পাকিস্তান)
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস : ৭৭ ওভারে ২৭৮/১০ (জয় ০, তানজিদ ২৬, মুমিনুল ২২, শান্ত ২৯, মুশফিক ২৩, লিটন ১২৬, মিরাজ ৪, তাইজুল ১৬, তাসকিন ৭, শরিফুল ১২*, নাহিদ ০; আব্বাস ৩/৪৫, শাহজাদ ৪/৮১, হাসান ২/৪৯, ১/৯৬)।
পাকিস্তান ১ম ইনিংসে : ৬ ওভারে ২১/০ (ফজল ৮, আজান ১৩)।



