সরকারের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা

ভুল থেকে বের হয়ে আসুন

Printed Edition
জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগরী আমির সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত
জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগরী আমির সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান সরকারি দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আসুন, ভুল মানুষ করে আমরাও করতে পারি। জাতি মনে করে আপনারা স্পষ্ট ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত, ভুল থেকে বের হয়ে আসেন। প্রথমে গণভোটের রায়কে মেনে নিন। তার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নিন। আমরা আপনাদের বাস্তবায়নে সহযোগিতা করব। কিন্তু জনগণের ওপর ফ্যাসিজম কায়েম করার জন্য সামান্য কিছু ময়লা-আবর্জনা যদি থাকে, সেটা আমরা মেনে নেবো না।

গতকাল শুক্রবার ঢাকার আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর ‘জেলা ও মহানগরী আমির সম্মেলনে’ উদ্বোধনী বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। সম্মেলনে সংগঠনের নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং সাংগঠনিক ৭৯টি জেলা ও মহানগরীর আমির-সেক্রেটারিরা উপস্থিত ছিলেন।

জামায়াত আমির বলেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সঙ্কট, সার-পানি সঙ্কট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে আলোচনা করা সরকারের পছন্দ নয়। তারা শুধু লুকোচুরি করছে। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন খোলামনে আলোচনা করে জাতীয় সঙ্কট উত্তরণে একসাথে কাজ করি।

বক্তব্যের শুরুতে জামায়াত আমির জুলাইযোদ্ধাদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জুলাই বিপ্লবের পর দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরটিকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করা। তারা সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে জাতির মধ্যে যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হয়নি। কেন হয়নি তা পরিষ্কার। নির্বাচনকে সুষ্ঠু হতে দেয়া হয়নি। ব্যাপক ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে।

জামায়াত আমির বলেন, ইতিহাস একদিন এই নির্বাচনের পোস্টমর্টেম করবে। সেদিন চুলচেরা আরো অনেক জিনিস বের হয়ে আসবে। তবে আমাদের ঐক্য (১১ দল) দেশ পরিচালনার জায়গায় গেল কি না সেটি বড় আফসোসের জায়গা নয়, জনগণের আকাক্সক্ষার মৃত্যু হলো। আমরা চাইনি দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক। এই নির্বাচন শেষ নির্বাচন নয়, এই মার্কা নির্বাচন ২০০৮ সালে হয়েছিল। সেই নির্বাচনে বোঝাপড়া করে পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতার মসনদে যারা গিয়েছিলেন, তারা তাদের পরিণতি বহন করে বিদায় হয়েছে। এখনো যদি কেউ এমন করে থাকেন, তাদের পরিণতি ভিন্ন কিছু হওয়ার কথা নয়-তা প্রমাণিত, কারণ প্রধান বিচারক আল্লাহ তায়ালা।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দেশে একটা সরকার গঠিত হয়েছে। বিশ্বে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশও আর্থিক ও জ্বালানি সঙ্কটের মুখোমুখি হোক- তা আমরা চাইনি। আমরা আন্দোলন সংগ্রামের দিকে যাবো এতে জনদুর্ভোগ বাড়বে, আমরা এটা চাইনি। কিন্তু আমাদের যখন সংসদে ন্যায্য বিষয়ে কথা বলতে দেয়া হবে না, তখন আমাদের জায়গা থাকে রাজপথ। কারণ আমরা জনগণের দায়িত্ব নিয়ে সেখানে ঢুকেছি।

তিনি বলেন, ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করে কার্যত জনগণকে অপমান করেছে সরকার। বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও রেফারেন্ডাম এভাবে বৃথা যায়নি। বাংলাদেশে চারটি রেফারেন্ডাম হয়েছে- এটা চতুর্থ। চতুর্থটাও বিএনপির হাতে। জিয়াউর রহমান যে গণভোট করেন সেই প্রথমটাও সংবিধানে ছিল না। শেষটাও সংবিধানে ছিল না। ওটা যদি জায়েজ হয় তাহলে এটা জায়েজ হবে না কেন? প্রশ্ন রাখেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, এটা মনের মতো হয়নি এজন্য এটা নাজায়েজ।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো সংস্কার প্রস্তাব অধ্যাদেশ আকারে এসেছিল। তার মধ্যে ছিল দুদক: দুদকের নিয়োগটা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বাইরে রেখে উপযুক্ত দক্ষ, নিরপেক্ষ লোক এনে এখানে বসানো। সেটা ওনারা তুললেন না, আটকিয়ে দিলেন। এরপর মানবাধিকার : এখানে একটু সামান্য আলোচনা করে এটাকে জোর করে পাস করিয়ে নিলেন। পুলিশ সংস্কার কমিশন: পুলিশে অনেক সংস্কার প্রয়োজন। স্বয়ং পুলিশ পুলিশের হাতে নিরাপদ নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তারা বৈষম্যের শিকার। এ সবগুলো বিষয় সেখানে ছিল। গুম কমিশন, গুম প্রতিরোধ আলোচনায় আনা হলো না। এই গুমের শিকার লোকেরাই তো এখন সংসদে সদস্য হয়ে এসেছেন। কেউ সাড়ে আট বছর, কেউ চার মাস। এ রকম লোকেরা এখানে আছেন। আমার গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা এখানে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। জোর করে এটাও ফেলে দেয়া হলো। তার মানে কি আবার গুম হবে? তার মানে কি আবার নতুন করে আয়নাঘর তৈরি করা হবে? প্রশ্ন রাখেন বিরোধীদলীয় নেতা।

ব্যাংক সংস্কার নিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ব্যাংক সংস্কারের জন্য ব্যাংক রেজুলিউশন। ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা লুট হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেল। এগুলো আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার অধ্যাদেশ ছিল। সেটা বাদ দেয়া হলো। কোথায় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? এখন ব্যাংকের ওপর থাবা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরকে অপদস্থ করা ও একজন ঋণখেলাপিকে গভর্নর পদে বসানোর সমালোচনা করেন তিনি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যাংকের মালিক দেশবাসী, কোনো দল নয়। সবাইকে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে, গর্জে উঠতে হবে। আপনার আমানত আপনাকে রক্ষা করতে হবে। জনগণের সাথে থাকার ঘোষণা দেন ডা: শফিকুর রহমান।

জামায়াত আমির বলেন, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক আদলে রেখে যতসব অবিচার করা হয়েছে, জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং আমাদের নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই ভুক্তভোগী হয়েছেন, কেউ কেউ অবিচারের শিকার হয়েছে। সেই জায়গায় স্বাধীন বিচারালয়ের আলাদা সচিবালয় হওয়ার কথা-এটাকে ঠেকিয়ে দেয়া হলো। তার মানে বিচারকে আর স্বাধীনভাবে চলতে দেয়া হবে না। আগের সেই ফ্যাসিবাদের কায়দায় এখন ডিক্টেশনের আন্ডারে বিচার চালানো হবে।

তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ সেখানে একটা নিরপেক্ষ বডি এটা করবে সেই রকম অধ্যাদেশ জারি হলো সেটাকে ঠেকিয়ে দিলো। এখানেও দলীয় প্রভাব। দলীয় ভিত্তিতে যখন বিচারক তৈরি হবে তখন বিচারপতি খায়রুল হক তৈরি হবে, বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক তৈরি হবে। শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ বিচারপতি এনায়েতুর রহিম তৈরি হবে। ওটা দলীয় ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগের কুফল। সে কুফল আপনারা ভোগ করলেন, আমরাও ভোগ করলাম। আবার কেন সেই পুরনো সংস্কৃতিতে ফিরে যাবো? পিএসসি গঠনে ঠিক একই কথা সেটাকে ঠেকিয়ে দেয়া হলো। এগুলো যখন বিদ্যমান থাকবে আমরা আশঙ্কা করছি অতীতের ফ্যাসিজমের চাইতে আগামীর ফ্যাসিজম হবে আরো ভয়াবহ। এ জন্য আমরা বলতে বাধ্য হয়েছি। যেদিন গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা হয়েছে সেদিন থেকে এই নতুন ফ্যাসিজমের যাত্রা শুরু হয়েছে।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক যত প্রতিষ্ঠান ছিল, সবগুলো ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে। খেলার ময়দানেও বাপের তালিকায় আবার কেউ স্বামীর তালিকায়- এভাবে দলীয়করণ করে ফেলা হলো। সিভিল প্রশাসনে যে লোকগুলো আসল দক্ষ সে লোকগুলোকে ওএসডি করা হচ্ছে। তাদের মেধা থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। আর জনগণের ওপর জুলুম করা হচ্ছে। পুলিশেও একই অবস্থা। সব দিকে একটা মহা নৈরাজ্য চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চোখের পলকে বিদায়। দুদক থেকে কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছেন, মানবাধিকার কমিশন থেকে পদত্যাগ করে খোলা চিঠি দিয়েছেন। বিচারকদের ওপর হস্তক্ষেপ করে এখন ২৮ জন বিচারককে শোকজ করা হয়েছে, অথচ বলা হচ্ছে বিচারকরা স্বাধীন। এ অল্প সময়ের ভিতরে তারা এ কাজগুলো করেছে। চাঁদাবাজির সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং হেলথ কার্ডও দিবেন এটা ভালো, কিন্তু সে জায়গায়ও দলীয়করণ। আবার এটাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি হচ্ছে। চাঁদাবাজি আগের চেয়ে এখন দিন দিন বাড়ছে।

দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর সমালোচনা করে ডা: শফিকুর রহমান জ্বালানি সঙ্কটে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, আরেকটি হলো-বাড়তি চাঁদার চাপ। এর সবটুকু খেটে খাওয়া মানুষের ঘাড়ে চাপছে। অথচ আপনারা বলেছিলেন দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি-মিডিয়া আর সমাজের বিভিন্ন জায়গার ভালো মানুষগুলোর ঠোঁট সেলাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এভাবে কারো ঠোঁট বা মুখ চিরদিন বন্ধ করা যায় না। তিনি বলেন, আমরা ন্যায়সম্মত সব কাজে সমর্থন এবং সহযোগিতা দিবো। অন্যায় এবং জনগণের অধিকার হরণ করার যত কাজ আছে সব কাজের বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়াবো, ইনশাআল্লাহ। এ ক্ষেত্রে একচুলও ছাড় দিবো না। জামায়াত আমির বলেন, আমাদের লড়াই আমাদের জাতির জন্য, সবার জন্য। এ লড়াই আপনাদের-আমাদের সবার। এ লড়াইয়ে আমরা একসাথে সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। আমরা দৃঢ় আস্থাশীল। জনগণের সব দাবি আদায় গণভোটের রায়ও বাস্তবায়ন হবে, ইনশাআল্লাহ। আইনি কোনো জটিলতায় এ পথে বাধা হয়ে থাকতে পারবে না। আইন মানুষের জন্য, সংবিধানও মানুষের জন্য। আইন এবং সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। এখন সংবিধানের কথা বললে সরকারি দলও নেই এবং বিরোধী দলও নেই। এটা কোন সংবিধানের বলে আসছে? এটা ন্যাশনাল কনসেনসাসের বলে আসছে, বলেন তিনি।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, রাজনীতির সেই স্লোগান কে মানে, কে মানে না-ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। আমরা কার্যত দেখতে পাচ্ছি-দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়! এই চরিত্রকে পাল্টাতে হবে। রাজনীতির এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে আর চলতে দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, বগুড়া আর শেরপুরে আরো দুই বিপদ ঘটে গেছে। এখন মানুষ বলে, ’৯৪ তে মাগুরা, ’২৬ সালে এসে বগুড়া। ফেয়ার ইলেকশন দিয়ে হয় আপনারা জিতবেন, না হয় আমরা জিতব- কেন এমন করা হলো?

দেশবাসীর উদ্দেশে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আপনাদের অধিকার কেউ ঘরে এনে দেবে না। হয়তো আপনারা বলবেন, আর কত ত্যাগ? হ্যাঁ, ত্যাগের রাস্তায় আমাদের চলতে হবে এবং কালো রাতের অবসান ঘটবে। কে বাঁচবো কে মরবো জানি না। কোন দল ক্ষমতায় আসবে, কোন দল ক্ষমতা থেকে যাবে- তাও জানি না। কিন্তু এটা জানি, মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি অবিচার করেন না। সুতরাং সুবিচার পাব, সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।