ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় বাধা লেবাননে ইসরাইলি হামলা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানের অভ্যন্তরে দীর্ঘ সময় ধরে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক অভিযান বা হামলা বন্ধ করা হয়েছে বলে ঘোষণা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়া কয়েক মাসের সঙ্ঘাতের পর অবশেষে মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ তার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তেমনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বারবার আভাস দিচ্ছেন ইরানের সাথে শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির। তবে লেবাননে ইসরাইলি হামলা এ ক্ষেত্রে একটি প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, বুধবার মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সামনে দেয়া এক বিবৃতিতে রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন এখন আর ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে দেশটির ভেতরে কোনো ধারাবাহিক ও অনবরত আক্রমণ পরিচালনা করছে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইনপ্রণেতাদের কাছে যুক্তি দিয়ে বলেন, এই সামরিক অপারেশনটি সফলভাবে ইরানের প্রতিরক্ষা-শিল্প ঘাঁটির একটি বড় অংশ ধ্বংস করেছে এবং একই সাথে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও ড্রোনের মজুত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে এনেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বজায় থাকার সময়েই রুবিওর এই বক্তব্য সামনে এলো।

এই যুদ্ধবিরতির মাঝেই সাম্প্রতিকতম চরম উত্তেজনার অংশ হিসেবে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের একটি বড় ড্রোন হামলা আঘাত হানে, যার ফলে একটি যাত্রীবাহী টার্মিনাল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত হন এবং আরো ডজনখানেক মানুষ আহত হন। এই ভয়াবহ হামলার কারণে বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং এর আগে যারা নিজেদের এই সঙ্ঘাত থেকে নিরাপদ মনে করেছিল, সেই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

চলতি বছরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন চতুর্থ মাসে পদার্পণ করেছে, যা একই সাথে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। ইরান এখনো বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস রফতানির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’-এর ওপর নিজস্ব সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং এর বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের প্রধান প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করছেন এবং এই পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করার জন্য এটিকে ‘চূড়ান্ত অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

রুবিও আইনপ্রণেতাদের আশ্বস্ত করে আরও বলেছেন যে তেহরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এবং প্রচেষ্টা এখনো পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির মতো কোনো দুর্বল চুক্তি আবার হতে পারে কি না- এমন উদ্বেগের জবাবে রুবিও জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতের যেকোনো চুক্তি অবশ্যই আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর হবে।

যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা বা জেসিপিওএর কথা উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট করেন যে শেষ পর্যন্ত তারা যদি কোনো চুক্তি করেন তবে তা একটি ভালো ও শক্তিশালী চুক্তি হবে, অন্যথায় কোনো চুক্তিই হবে না এবং এটি নিশ্চিতভাবেই জেসিপিওএর চেয়ে অনেক ভালো হবে, যা থেকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বের হয়ে এসেছিলেন।

তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, লেবাননের বৈরুতের ওপর হামলার মুখে তারা ‘চুপ থাকবে না’।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈরুতের ওপর যেকোনো হামলা পুরো অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত উসকে দিতে পারে এবং ফের ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে। বুধবার লেবাননভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মায়াদিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন আরাঘচি। তিনি আরো বলেন, তেহরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরোধ তখনই শেষ হবে, যখন লেবাননে হামলা বন্ধ হবে। তার জোরালো দাবি, যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে অবশ্যই লেবাননকে যুক্ত করতে হবে। আরাকচি বলেন, যুদ্ধ বন্ধের জন্য লেবানন থেকে ইসরাইলি বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে হবে। মার্চের শুরু থেকে লেবাননে হামলা চালিয়ে আসছে ইসরাইল।

এ দিন শর্তসাপেক্ষে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে সম্মত হয় ইসরাইল ও লেবানন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বুধবার ওয়াশিংটনে ত্রিপক্ষীয় এক বৈঠকে দেশ দু’টি তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি’তে পৌঁছায়। এক যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। চুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি কার্যকর হওয়া ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর হামলা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হওয়ার ওপর নির্ভর করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার শর্ত হলো, হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি হামলা বন্ধ করতে হবে। সেই সাথে দক্ষিণ লেবানন থেকে গোষ্ঠীটির সদস্যদের সরিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া দুই দেশ কিছু ‘পাইলট জোন’ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একমত হয়েছে। এসব এলাকা লেবানিজ সশস্ত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সেখানে কোনো অরাষ্ট্রীয় পক্ষ বা সশস্ত্র গোষ্ঠী থাকতে পারবে না। তবে হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি মানবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

হিজবুল্লাহ বহুবার বলেছে, তারা ইসরাইল-লেবানন যুদ্ধবিরতি আলোচনাকে স্বীকৃতি দেয় না এবং তা মেনে চলবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, খুব সম্ভবত, ইরান-মার্কিন আলোচনার অংশ হিসেবে লেবাননে একটি শর্তহীন যুদ্ধবিরতি না হওয়া পর্যন্ত হিজবুল্লাহ লড়াই চালিয়ে যাবে।

এ দিকে এএফপি জানায়, ওয়াশিংটনে আলোচনার পর ইসরাইল ও লেবানন শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি কার্যকরে সম্মত হওয়ার ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরাইল গতকাল বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননে বিমান হামলা চালিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ)’ জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে সড়ক লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত একটি হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার সকালে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, দেশটির উত্তরাঞ্চলে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। একটি ঘটনায় ‘সন্দেহজনক আকাশযান’ শনাক্ত করা হলেও, পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আরেকটি ঘটনা পরে ভুয়া সতর্কতা হিসেবে চিহ্নিত হয়।

বুধবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত চতুর্থ দফা বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরাইল ও লেবানন যুদ্ধবিরতি কার্যকরে সম্মত হয়েছে। তবে এর জন্য হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি গোলাবর্ষণ বন্ধ করতে হবে। আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা দু’পক্ষ আরো সম্মত হয়েছে যে কিছু ‘পাইলট জোন’ গঠন করা হবে। সেখানে লেবাননের সশস্ত্রবাহিনী এককভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং সেখানে কোনো অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকবে না।

তকে ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির বৃহস্পতিবার এই চুক্তির সমালোচনা করে একে ‘গুরুতর ভুল’ বলে মন্তব্য করেন। ঘোষণার আগে বৃহস্পতিবার ভোরে হিজবুল্লাহ জানায়, তারা দক্ষিণ লেবাননের কানতারা এলাকায় অবস্থানরত ইসরাইলি সেনা ও সামরিক যান লক্ষ্য করে ‘রকেটের একটি দফা হামলা’ চালিয়েছে। পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বউফোর্ট দুর্গের কাছে সেনাদের লক্ষ্য করে ড্রোনও পাঠানো হয়েছে। এর আগে ১৭ এপ্রিল লেবাননের সঙ্ঘাত বন্ধে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তবে সেটি কখনোই বাস্তবে মানা হয়নি। উভয়পক্ষই পরস্পরের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে হামলা অব্যাহত রাখার যৌক্তিকতা দেখিয়েছে।