তিন মাস পর ডিএসই সূচক ৫ হাজার ৪০০ পয়েন্ট ছাড়াল

ডেফোডিল কম্পিউটারের ঋণ ইক্যুইটিতে রূপান্তরে বিএসইসির না

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

ঈদুল আজহার ছুটির পর টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সূচক ও লেনদেনের উন্নতির ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে দেশের পুঁজিবাজার। এরই অংশ হিসেবে গতকাল তিন মাস পর ফের পাঁচ হাজার ৪০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করেছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি। এর আগে সর্বশেষ চলতি বছরের ২ মার্চ পাঁচ হাজার ৪০০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান করছিল সূচকটি। কিন্তু পরবর্তিতে ইরান-মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হলে ব্যাপকভাবে পতন ঘটে দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকের। যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ দিন এ সূচক পাঁচ হাজার ২০০ পয়েন্টের আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছিল। পরবর্তিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর আবার গতি ফিরতে শুরু করে পুঁজিবাজারে। মে মাসের শুরু থেকে বিনিয়োগকারিদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে যার ফলে আবার গতি ফিরে পাচ্ছে পুঁজিবাজার।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৩ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। পাঁচ হাজার ৩৭২ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৪০৬ দশমিক ২০ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৫ দশমিক ২০ ও ২ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সাার্বিক মূল্যসূচকের এদিন ১০৩ দশমিক ২৫ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৭৫ দশমিক ৩০ ও ৫৮ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি লেনদেনও বেড়েছে ঢাকা শেয়ারবাজারে। ডিএসই গতকাল এক হাজার ৮০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১৬৮ কোটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৯১২ কোটি টাকা। এই লেনদেনের মধ্যে ৪০ কোটি টাকা ছিল ব্লক মার্কেটে আর এক হাজার ৪০ কোটি টাকা নিয়মিত মার্কেটে লেনদেন হয়। তবে একই সময় লেনদেন হ্রাস পেয়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। গতকাল সিএসই লেনদেন নিষ্পত্তি করে ২৭ কোটি টাকার যা আগের দিন অপেক্ষা ২০ কোটি টাকা কম। সোমবার সিএসইর লেনদেন ছিল ৪৭ কোটি টাকা। ২৭ কোটি টাকার মধ্যে এককভাবে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগের লেনদেন ছিল ১৩ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার আচরণের ইতিবাচক এ পরিবর্তনে আবারো ব্যাংকিং খাতে ফিরতে শুরু করেছেন বিনিয়োগকারিরা। গতকালও ডিএসইর লেনদেনে ব্যাংকিং খাতের প্রাধান্য দেখা গেছে। বাজারটির লেনদেনের শীর্ষ তিনটি কোম্পানিই ছিল ব্যাংক। বরাবরই পুঁজিাবাজারের ভালো সময়ে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর দিকেই বেশি নজর থাকে বিনিয়োগকারিদের। ফলে ব্যাংকসহ অন্যান্য ভালো কোম্পানিতেই বিনিয়োগ করে থাকেন তারা। এবারো ব্যাংকিং খাতের ভালো কোম্পানিগুলোই আগ্রহ কাড়ছে সবার।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং খাতের মতো মূলধন সমৃদ্ধ খাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলে সূচকের পাশাপাশি লেনদেনও গতি পায়। ঝুঁকি বিবেচনায় এখনো ব্যাংকিং খাতই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে বলে মনে করেন তারা। কারণ এ খাতের মূল্য আয় অনুপাত (পিই) ৪ দশমিক ৮৯ যা ডিএসইর সর্বনিম্ন। ফলে এ খাতে বিনিয়োগ ঝুঁকি সবচেয়ে কম। তবে ব্যাংকিং খাতের বাইরে অন্যান্য কয়েকটি খাতে ভালো মৌলভিত্তির আরো বেশ কিছু কোম্পানি রয়েছে যেগুলো এখনো তেমন একটা সাড়া পাচ্ছে না। তবে বাজার আচরণের এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোই হতে পারে বিনিয়োগকারীদের পরবর্তি পছন্দ।

এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানি ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স পিএলসির একটি ঋণকে ইক্যুইটি তথা সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরের প্রস্তাব আবারো নাকচ করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিটি একই উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন ড্যাফোডিল গ্রুপ কনসার্নের কাছ থেকে নেয়া ৪৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার ঋণকে ইক্যুইটিতে রূপান্তর করতে চেয়েছিল। এর জন্য তাদের নামে নতুন শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিএসইসি তাদের এই প্রস্তাবকে যৌক্তিক মনে না করায় তা নাকচ করে দিয়েছে।

সোমবার (১ জুন) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

পাওয়া তথ্য অনুসারে, গত বছরের ১০ নভেম্বর ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের পরিচালনা পর্ষদ দ্বিতীয়বারের মতো ড্যাফোডিল গ্রুপ কনসার্নের কাছ থেকে নেয়া ঋণকে ইক্যুইটিতে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত অনুসারে, ওই ঋণের বিপরীতে নতুন শেয়ার ইস্যু করা হবে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতি শেয়ারে প্রিমিয়াম নেয়া হবে ৫ টাকা। তাতে শেয়ারের ইস্যুমূল্য দাঁড়াবে ১৫ টাকা। শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতি ও বিএসইসির অনুমতি পেলে তিন কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার শেয়ার ইস্যু করা হবে; যার মোট মূল্য হবে ৪৯ কোটি তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) শেয়ারহোল্ডাররা আলোচিত প্রস্তাবে সম্মতি দিলে কোম্পানিটি বিএসইসির কাছে অনুমোদন চেয়ে আবেদন করে। তবে এবারো তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিএসইসি। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের পরিচালনা পর্ষদ প্রথমবারের মতো ড্যাফোডিল গ্রুপ কনসার্নের কাছ থেকে নেয়া ৪৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার ঋণকে ইক্যুইটিতে রূপান্তর করা এবং এর বিপরীতে চার কোিিট ৬৭ লাখ নতুন শেয়ার ইস্যু করে মূলধন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তখন অভিহিত মূল্য ১০ টাকা দরে আলোচিত শেয়ার ইস্যু করার সিদ্ধান্ত হয় পর্ষদ সভায়। গত বছরের ২২ জুলাই অনুষ্ঠিত বিএসইসির ৯৬৪তম কমিশন সভায় ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের আলোচিত প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এ দিকে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ারের দাম। সোমবার ডিএসইতে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৫ টাকা ৮০ পয়সা বেড়ে ১৪২ টাকা ৫০ পয়সা উঠেছে। তবে ওই দিন এ তথ্য প্রকাশের পর গতকাল কোম্পানিটির শেয়ারদর সামান্য হ্রাস পায়। গতকাল কোম্পানিটির শেয়ারের মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) দাঁড়িয়েছে ৮৯০, যাকে অস্বাভাবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।