দুই বছরের সিলেবাস মাত্র ১৩ মাসে শেষ করে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের ঘোষণা চরম অমানবিক এবং শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ বলেও মনে করেন অভিভাবক ও অংশীজনরা। ফলে শিক্ষামন্ত্রীর দেয়া ঘোষণা অনুযায়ী চলতি বছরের ডিসেম্বরেই ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা আপতত হচ্ছে না। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সাথে অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অংশীজনদের সভা শেষে এমনই আভাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন একজন শিক্ষার্থীকে যেখানে দুই বছর সময় দেয়া হয় একটি পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সেখানে মাত্র ১৩ মাসের মধ্যে তাদেরকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য করা একরকমের মানসিক চাপ, যা অমানবিক এবং জুলুম। সভা সূত্র জানায়, আগামী বছরের (২০২৭ সালের) এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নেয়ার প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে শিক্ষার্থীসহ অংশীজনরা বলছেন ‘হুট করে’ ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরে নেয়া ঠিক হবে না। এ ক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ এসএসসি পরীক্ষা আগামী বছরের জানুয়ারিতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা এপ্রিল বা জুনে নেয়া যেতে পারে।
গতকাল বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের উপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই দুই পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে অংশীজনদের সাথে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় এমন মতামত উঠে আসে। বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন অভিভাবক ও কর্মকর্তা জানান, আজকের (বুধবারের) উপস্থিত অংশীজনদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এ বছরের ডিসেম্বরে হবে না, পরবর্তী বছরই হবে। অভিভাবকদের মতে এসএসসি এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা। প্রতি বছর এই দুই পরীক্ষায় সারা দেশে লাখ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বর্তমানে একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে যে বছর দশম শ্রেণীর ক্লাস শেষ করে, তার পরের বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ পায়। এইচএসসির ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির শুরুতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা এপ্রিলের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। তবে করোনা পরিস্থিতির পর থেকে এই সূচি আর বজায় রাখা যাচ্ছে না; বরং আরো পিছিয়েছে। চলতি বছরের (২০২৬ সাল) এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত ২১ এপ্রিল, আর এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে আগামী জুলাই মাসে।
এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গতকাল এই মতবিনিময় সভায় ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি নেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া ভবিষ্যতে এই দুই পরীক্ষায় বিষয় কমানোর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অবশ্য এর আগে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আ ন ম এহছানুল হক মিলন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই বলা হয়েছিল ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরে নেয়া হবে। আর এমন একটি পরিকল্পনা প্রকাশের পর এ নিয়ে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তবে গতকালের সভায় অংশীজনদের পক্ষ থেকে ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরে না নেয়ার পক্ষে মত এসেছে।
এইচএসএসি পরীক্ষার বিষয়ে এক অভিভাবক বলেন, গত বছরের (২০২৫) একাদশ শ্রেণীর ক্লাস শুরু হয়েছিল ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর। সুতরাং ডিসেম্বরে পরীক্ষা নিতে গেলে পাঠ্যসূচিই শেষ হবে না। আর দুই সময়ের মধ্যে দু’টি রমজান মাস রয়েছে। সেখানে দুই মাস কলেজ বন্ধ থাকবে। বাকি ১৩ মাসে পরীক্ষার পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। বৈঠকে অংশ নেয়া আরেকজন বলেন, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ওই বছরের জানুয়ারিতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা জুনে নেয়ার পক্ষেই বেশির ভাগ মতামত এসেছে। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষাবর্ষ জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ডিসেম্বরে শেষ হয়। তবে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় জুলাই মাসে। আবার দেশে উচ্চশিক্ষার সেশনও শুরু হয় জুলাই থেকে। তাই শিক্ষাবিদরা বলে আসছেন বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নেয়া গেলে তা ইতিবাচক হবে। কিন্তু সেই কাজটি করতে হবে সমন্বিতভাবে। তবে হুটহাট করে নয়, পরিকল্পিতভাবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ দিকে এর আগে গতকাল সকালে অপর এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন শিক্ষায় জট দূর করতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সিলেবাস নিয়ে কাজ শুরু করা হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কার্পণ্য করা হচ্ছে না। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হতে যাতে কোনো সেশনজট না হয় এ নিয়ে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার। এসএসসি পাস করতে ১০ বছরের স্কুলিং যেন ১০ বছরই থাকে, তার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এইচএসসি পরীক্ষাও ১২ বছরের মধ্যে সম্পন্ন করতে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।



