হাবিবুল বাশার
বিকেলের তপ্ত রোদের তেজ কমতেই ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন বা কমলাপুরের আকাশজুড়ে খেলা করে এক অদ্ভুত মায়া। সারি সারি রেললাইন, ওপর দিয়ে চলে যাওয়া আধুনিক মেট্রোরেলের ঝনঝনানি আর আশপাশে গড়ে ওঠা আকাশচুম্বী অট্টালিকা সবই যেন আধুনিক ঢাকার দম্ভ। কিন্তু এই সুউচ্চ অট্টালিকার ছায়াতলে কমলাপুর এক অন্য জগৎ, যেখানে যান্ত্রিক ব্যস্ততার ভিড়েও রমজান মাসে ফুটে ওঠে মানুষের প্রতি মানুষের গভীর মমত্ববোধ ও সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা।
কমলাপুর মানেই মানুষের অন্তহীন স্রোত। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন তথ্য (বাংলাদেশ রেলওয়ে ও জাইকা) অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে এই স্টেশন দিয়ে এক লাখ ১৫ হাজার থেকে এক লাখ ৫০ হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। প্রতিদিন প্রায় ৭০ জোড়া (১৪০টি) ট্রেনের আসা-যাওয়ায় স্টেশনটি থাকে প্রাণচঞ্চল।
তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পাশেই বাস করে এক নিঃস্ব জনপদ। ইউনিসেফ ও বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকার পথশিশুদের প্রায় ২৩ শতাংশই রেলস্টেশন কেন্দ্রিক। কমলাপুর ও সংলগ্ন এলাকায় স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে প্রায় তিন থেকে পাঁচ হাজার ছিন্নমূল শিশু ও মানুষ অবস্থান করে। বড় বড় দালানের পাশে এই দরিদ্র জনশক্তির অবস্থান সমাজের প্রকট বৈষম্যকে যেমন ফুটিয়ে তোলে, তেমনি রমজানে তাদের ঘিরে তৈরি হওয়া মানবিকতা এক ভিন্ন বার্তা দেয়।
৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ‘মজার স্কুল’ ও মানবতার ছোঁয়া : বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসে, কমলাপুর স্টেশনের ৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মে তখন এক ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এখানে অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন পরিচালিত ‘মজার স্কুল’-এর শাখায় বসে ইফতারের আয়োজন। প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু, অসহায় যাত্রী ও রিকশাচালকদের নিয়ে এখানে সাজানো হয় ইফতারের দস্তরখান। মেনুতে থাকে ছোলা-বুট, আলুর চপ, পিঁয়াজু, মুড়ি আর এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত।
মজার স্কুলের কমলাপুর শাখার কো-অর্ডিনেটর রাইহান হোসেন বলেন, ‘রমজানে আমরা প্রতিদিনই এই ইফতারের আয়োজন করি। মূলত অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষরাই এখানে ইফতার করেন। আমরা আমাদের স্কাউট ফাইন্ডিং-এর মাধ্যমে এই ইফতার বিতরণ করি। প্রতিদিন ২০-২৫ জন থাকলেও মাঝে মাঝে আমরা ৫০ থেকে ১০০ জনের বড় আয়োজন করে থাকি।”
মসজিদের ভেতরে কর্মচারীদের ইফতার ও সম্প্রীতি
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন মসজিদের চিত্রটি আরো বেশি আন্তরিক। ইফতারের আজান হওয়ার আগ মুহূর্তে সেখানে দেখা যায় স্টেশনের বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীদের ব্যস্ততা। রেলওয়ের খালাসি, পোর্টার, কিনার থেকে শুরু করে অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্মচারী গোল হয়ে বসে একসাথে ইফতার করেন। মসজিদের নিয়মিত মুসল্লিরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় বড় বড় থালায় ইফতার সাজিয়ে বসেন, যেখানে কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই কুলি, মুসাফির এবং কর্মচারীরা এক সারিতে বসে খাবার ভাগ করে নেন। কর্মচারীদের এই যৌথ ইফতার স্টেশনের দীর্ঘ কর্মব্যস্ততার মাঝে এক মুহূর্তের প্রশান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করে।
ইফতারের আয়োজনে অংশ নেয়া রিকশাচালক বলেন, সারা দিন আয় হয় কম। ইফতারের সময় হইলে কই যামু, কী খামু হেই চিন্তা থাকে। এইখানে আইলে একটু ভালোমন্দ খাইতে পারি।
১০ বছরের এক পথশিশু আধো-আধো হাসিতে বলে, “ইফতারের সময় বড় মানুষরা যখন আমাগো লাইনে বইসা খাইতে দেয়, তখন খুব আনন্দ লাগে। মনে হয় আমরাও কারো না কারো আপন মানুষ।”
স্টেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাঝে মাঝে বিভিন্ন সংগঠন তাদের ইফতার দেয়। এবারো দু-একটি ফাউন্ডেশন দু-একদিন ইফতার বিতরণ করেছে। তবে এই উৎসবের মাঝেও এক করুণ চিত্র লুকিয়ে থাকে। প্ল্যাটফর্মের এক কোণে দেখা যায়, যারা অনেককে কারো কাছ থেকে ইফতারের প্যাকেট পাওয়ার আশায় অপলক চেয়ে থাকেন। কেউ ইফতার করছেন তৃপ্তিতে, আর কেউ হয়তো এক গ্লাস পানিতে বা ইফতার না করেই পার করছেন রমজানের সন্ধ্যা।
কমলাপুর কেবল একটি পরিবহন কেন্দ্র নয়; এটি যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। যেখানে যান্ত্রিকতা আর মমতা পাশাপাশি বাস করে। যান্ত্রিক এই শহরে কমলাপুরের ইফতারি মুহূর্তগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়- মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই, মানুষের তরেই মানুষের জীবন।


